লোকসানে ডুবেও লভ্যাংশ, আরএকে সিরামিকসের বিপরীত চিত্র

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ বার
লোকসানে ডুবেও লভ্যাংশ, আরএকে সিরামিকসের বিপরীত চিত্র

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের টাইলস ও সিরামিকস শিল্পের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান আরএকে সিরামিকস পিএলসি ক্রমবর্ধমান লোকসানের মুখে পড়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৪–২৫ অর্থবছর শেষে কোম্পানিটির লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ কোটি টাকায়, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় উদ্বেগজনক হারে বেশি। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে যেখানে কোম্পানিটি প্রায় আড়াই কোটি টাকার কিছু বেশি লোকসান করেছিল, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে লোকসানের অঙ্ক প্রায় ষোল গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

লোকসানের এই বড় ধরনের প্রবণতা দেশের সিরামিক শিল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের উচ্চমূল্য, কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলার সংকট, নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে শিল্প খাতের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আরএকে সিরামিকসের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে।

এমন লোকসানের মধ্যেও কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ সাধারণ শেয়ারধারীদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বিনিয়োগ মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন বুধবার শেয়ারবাজারে লেনদেন বন্ধ থাকায় বৃহস্পতিবার ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আরএকে সিরামিকস তাদের আর্থিক ফলাফল ও লভ্যাংশ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে।

কোম্পানি সূত্র জানায়, ঘোষিত এই ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ পরিশোধ করতে গিয়ে আরএকে সিরামিকসকে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। তবে লোকসানের কারণে উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা কোনো ধরনের লভ্যাংশ গ্রহণ করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাধারণ শেয়ারধারীদের আস্থা ধরে রাখা এবং দীর্ঘদিনের বিনিয়োগকারীদের প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই এই লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

আরএকে সিরামিকসের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছর শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩ পয়সায়। আগের অর্থবছরে এই লোকসানের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়েছে ৮৭ পয়সা, যা কোম্পানির আর্থিক অবস্থার অবনতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

কোম্পানি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। এর ফলে টাইলস ও সিরামিক পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রপ্তানি বাজারেও প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি না আসায় কোম্পানির সামগ্রিক বিক্রি চাপের মুখে পড়েছে।

এই বাস্তবতায় লোকসান বাড়লেও শেয়ারবাজারে আরএকে সিরামিকসের শেয়ারের দাম বেড়েছে, যা অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ৬০ পয়সা বা প্রায় আড়াই শতাংশ বেড়ে ২৪ টাকায় দাঁড়ায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, লোকসানের মধ্যেও নগদ লভ্যাংশ ঘোষণার কারণেই শেয়ারদরের এই ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে লোকসানি কোম্পানিও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার মৌলিক ভিত্তি শক্ত না হলে শুধু লভ্যাংশ দিয়ে বিনিয়োগকারীদের সন্তুষ্ট রাখা সম্ভব নয়। আরএকে সিরামিকস যেহেতু ‘এ’ ক্যাটাগরিভুক্ত একটি ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানি, তাই বিনিয়োগকারীরা হয়তো ভবিষ্যতে ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবে—এই আশায় শেয়ার ধরে রাখছেন।

২০১০ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া আরএকে সিরামিকস দেশের সিরামিক শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিচিত নাম। আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একসময় কোম্পানিটির বিক্রি ও মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট এবং ভোক্তা চাহিদার পতন কোম্পানিটিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং নির্মাণ খাতে গতি ফিরলে সিরামিক শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে আরএকে সিরামিকসের মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তার আগে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বাজার সম্প্রসারণ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে বলে মত বিশ্লেষকদের।

সব মিলিয়ে, আরএকে সিরামিকসের সর্বশেষ আর্থিক ফলাফল একদিকে যেমন দেশের শিল্প খাতের চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরছে, অন্যদিকে লোকসানের মধ্যেও লভ্যাংশ ঘোষণার সিদ্ধান্ত শেয়ারবাজারে নতুন করে আলোচনা ও আগ্রহ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, ভবিষ্যৎ অর্থবছরে কোম্পানিটি কীভাবে এই সংকট কাটিয়ে ওঠে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন বাস্তব ব্যবসায়িক সাফল্যে রূপ দিতে পারে কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত