গুম সংক্রান্ত সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহার: মানবাধিকারে নতুন অধ্যায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৮ বার
গুম সংক্রান্ত সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহার: মানবাধিকারে নতুন অধ্যায়

প্রকাশ: ৫ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘের কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ১৪(১)-এর বিষয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহারের প্রস্তাব জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছে। মানবাধিকার সংরক্ষণে এটি বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও দৃঢ় ও বিশ্বাসযোগ্য করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, গত ২৯ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সাপ্তাহিক বৈঠকে অনুচ্ছেদ ১৪(১)-সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র প্রত্যাহারের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি জাতিসংঘে উপস্থাপন করা হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় ১৯৮৪ সালে। বর্তমানে বিশ্বের ১৭৩টি রাষ্ট্র এই কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে কনভেনশনটিতে যোগ দিলেও অনুচ্ছেদ ১৪(১)-এর ক্ষেত্রে একটি সংরক্ষণী শর্ত আরোপ করেছিল। এই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায্য ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ছাড়াও বাহামা, ফিজি, নিউজিল্যান্ড, সামোয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—এই পাঁচটি রাষ্ট্র কনভেনশনে যোগদানের সময় অনুচ্ছেদ ১৪(১)-এর ক্ষেত্রে সংরক্ষণী শর্ত দিয়েছিল। এর ফলে এসব দেশে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন বা গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ দীর্ঘদিন ধরে সীমিত ছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই সংরক্ষণী শর্তগুলো কার্যত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে মানবাধিকার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে এখন রাষ্ট্রীয় নির্যাতন বা গুমের শিকার ব্যক্তি কেবল বিচার নয়, বরং ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিও আইনি ও নৈতিকভাবে উত্থাপন করতে পারবেন। শুধু তাই নয়, নির্যাতনের কারণে কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তাঁর ওপর নির্ভরশীল পরিবার-পরিজনও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হবেন।

উপদেষ্টা পরিষদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করবে যে বাংলাদেশ মানবাধিকার বিষয়ে কেবল প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণে আগ্রহী।

মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই এই সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাদের মতে, গুম ও নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না হলে বিচার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই দাবির বাস্তবায়ন হওয়ায় মানবাধিকার অঙ্গনে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার হয়েছে।

আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে। জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবাধিকার ফোরামে বাংলাদেশকে প্রায়ই গুম ও নির্যাতন সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহারের ফলে ভবিষ্যতে এসব প্রশ্নের জবাব আরও দৃঢ়ভাবে দেওয়া সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে এটি দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামো শক্তিশালী করারও সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন প্রয়োজন জাতীয় আইন ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে এমন বিধান যুক্ত করা, যাতে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার বাস্তবে কার্যকর হয়। নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।

উপদেষ্টা পরিষদ মনে করে, এই পদক্ষেপ কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নয়, দেশের ভেতরেও একটি শক্তিশালী বার্তা দেবে—রাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে আর এড়িয়ে যাবে না। বরং ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেবে।

সব মিলিয়ে, জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার এই ঘটনা মানবাধিকার সংরক্ষণে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি শুধু একটি কূটনৈতিক সাফল্য নয়, বরং নির্যাতন ও গুমের শিকার অসংখ্য মানুষের জন্য ন্যায়বিচার ও মর্যাদার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত