ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় টহল দেবে এক লাখ সেনা সদস্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৪ বার
ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় টহল দেবে এক লাখ সেনা সদস্য

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিরাপদ রাখতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে এক লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সেনা সদর দপ্তর। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এবারই প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনীকে ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত টহল দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা আগের কোনো নির্বাচনে দেখা যায়নি।

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তানে অবস্থিত রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ও কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মনজুরুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী পরিবেশে আস্থা ফেরাতেই সেনা মোতায়েনের এই ব্যাপক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, অতীতের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪২ হাজার সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই সংখ্যা এক লাখে উন্নীত করা হয়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, এবার সেনাবাহিনীকে শুধু স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দূরে রাখা হয়নি, বরং ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় উপস্থিত থেকে টহল দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে ভোটাররা কেন্দ্র পর্যন্ত নির্বিঘ্নে যেতে পারবেন এবং কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মনজুরুল ইসলাম বলেন, আগের নির্বাচনগুলোতে সেনাবাহিনী মূলত দূরবর্তী অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করত এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হস্তক্ষেপ করত। কিন্তু এবার নির্বাচন কমিশন ও বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে আরও সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে নির্বাচনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন—এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সেনাবাহিনী প্রধান প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য রেখে বাকি সেনাদের মাঠে নামিয়েছেন। পুরো কার্যক্রমের উদ্দেশ্য একটাই—একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা।

সংবাদ সম্মেলনে যানবাহন সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন এই সেনা কর্মকর্তা। তিনি জানান, এত বিপুলসংখ্যক সেনা সদস্য মোতায়েনের জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহনের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। এ জন্য অসামরিক প্রশাসনের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছে, যাতে তারা রিকুইজিশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় গাড়ি সরবরাহ করতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে সেই সহায়তা পাওয়া না যাওয়ায় প্রয়োজনে গাড়ি ভাড়া করেও সেনা সদস্যদের টহল কার্যক্রম চালু রাখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সেনা সদস্যরা দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন। গত ২০ জানুয়ারি থেকেই এই টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—ভোটারদের মধ্যে যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনা। সেনাবাহিনী বিশ্বাস করে, দৃশ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভোটারদের মনে সাহস জোগাবে এবং ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি বাড়াতে সহায়ক হবে।

নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহিংসতার আশঙ্কা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, এই ব্যাপক সেনা মোতায়েন তারই প্রতিক্রিয়া বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় সেনা টহল থাকলে প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা কমবে এবং অনিয়মের সুযোগও সীমিত হবে।

সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন, নির্বাচনী দিনে কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানোই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভোটাররা নানা ধরনের ভয়ভীতির মুখে পড়েন। এবারের এই নতুন ব্যবস্থা ভোটারদের সেই শঙ্কা অনেকটাই দূর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তাও মনে করছেন, সেনাবাহিনীর এই সক্রিয় ভূমিকা নির্বাচনী পরিবেশকে ইতিবাচক করবে। যদিও কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সেনা মোতায়েনের সংখ্যা বাড়ানো কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তাও বহন করে। এর মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দেখাতে চাচ্ছে যে তারা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আন্তরিক। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মহলের নজর যখন বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে, তখন এই ধরনের পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তাঁরা।

সব মিলিয়ে, এক লাখ সেনা সদস্যের মোতায়েন এবং ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় টহলের অনুমতি এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই উদ্যোগ কতটা সফল হয়, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব প্রয়োগ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতার ওপর। তবে সেনা সদর ও প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত