প্রকাশ: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অস্ট্রেলিয়ার সরকার বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জোগকে গ্রেফতারের সম্ভাব্য আহ্বান এড়িয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট হার্জোগ বন্ডাই সমুদ্র সৈকতে চলা গণহত্যার শিকারদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং দেশটির ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় সফর করছেন। সফরটি চার দিনের, যা সোমবার থেকে শুরু হয়েছে।
সিডনিতে হানুক্কা উৎসবে ১৪ ডিসেম্বর ঘটে যাওয়া বোমা হামলায় ১৫ জন নিহত হওয়ার পর ইহুদি সম্প্রদায়ের সাথে দেখা করার জন্য হার্জোগকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে তার আগমনের আগে মানবাধিকার আইনজীবী ক্রিস সিদোতি প্রকাশ্যে আহ্বান জানান, ‘যদি প্রেসিডেন্ট আসে, তাকে গ্রেফতার করা উচিত।’ সিদোতি জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের একজন সদস্য, যিনি ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো তদন্ত করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ইসরায়েলি রাষ্ট্রপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়ে একটি ভুল করেছেন, যা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত ছিল।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ইহুদি সম্প্রদায়ের ইচ্ছার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। তিনি আরও জানান, এই আমন্ত্রণ মূলত বন্ডাই হামলার শিকারদের সম্মান জানাতে এবং এ মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়ান ইহুদি সম্প্রদায়ের পাশে থাকার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। তিনি বলেন, “এটি আমাদের দেশের সন্ত্রাসবিরোধী সংহতি ও মানবিক সহানুভূতির পরিচয় বহন করছে।”
হার্জোগের সফরের বিষয়টি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভও হয়েছে। ফিলিস্তিনপন্থি কর্মীরা তাঁর সফরের বিরুদ্ধে সিডনিসহ সারাদেশে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। তবে সিডনির পুলিশ বন্ডাই হামলার পর নতুন ক্ষমতার অধীনে এই বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি। পুলিশ এক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছে।
এছাড়া, অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশ বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, সিডনির ১৯ বছর বয়সী এক যুবকের বিরুদ্ধে একজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে অনলাইনে ‘হত্যার হুমকি’ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হার্জোগ এই হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারতেন, তবে পুলিশ এখনো নিশ্চিত করে তা জানায়নি।
মানবাধিকার আইনজীবী ক্রিস সিদোতি বলেন, ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ একটি “বোকামিপূর্ণ ভুল” এবং এটি বাতিল করা উচিত ছিল। তার যুক্তি, হার্জোগের শীর্ষ নেতৃত্বে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের কারণে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী বিচারাধীন। তিনি বলেন, “এ ধরনের রাষ্ট্রপ্রধানের সফরের সময় কোনো দেশে গ্রেফতারের সম্ভাবনা থাকলে তা দেরি না করে প্রয়োগ করা উচিত।”
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার সরকার এই আহ্বান এড়িয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে শান্তিপূর্ণ এবং কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে। সরকার জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট হার্জোগের সফরের উদ্দেশ্য মূলত শোকাহত সম্প্রদায়কে সমর্থন জানানো এবং গণহত্যার শিকারদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন।
হার্জোগের সফরকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই সফর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি অস্ট্রেলিয়ার ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া, দেশটির ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার ভিতরে নিরাপত্তা ও মানবিক নীতির সংযোজন প্রমাণিত হচ্ছে।
ফিলিস্তিনপন্থি গ্রুপগুলো এই সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ডাক দিচ্ছে। তারা বলছে, প্রেসিডেন্ট হার্জোগের নেতৃত্বে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে ফিলিস্তিনি জনগণ শিকার হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী তাঁকে বিচারের আওতায় আনা উচিত। তবে অস্ট্রেলিয়ার সরকার রাজনৈতিক ও মানবিক কারণে গ্রেফতারের আহ্বান এড়িয়েছে।
ফেডারেল পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইনে হুমকির ঘটনা তদন্ত চলছে। দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করতে চাইছে যে, প্রেসিডেন্ট হার্জোগের সফর নির্বিঘ্নে এবং শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে। প্রেসিডেন্টের সফরকালীন সময়ে বন্ডাই সমুদ্র সৈকত ও সিডনির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিরাপত্তার জন্য ঘনিষ্ঠ নজরদারিতে থাকবে।
সাম্প্রতিক এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে স্থান পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার সরকারের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও মানবিক ভারসাম্য বজায় রাখার একটি প্রয়াস। তারা মনে করছেন, এটি দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও ইহুদি সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই সফর ও সম্পর্কিত বিক্ষোভ, হুমকি এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত বিতর্ক অস্ট্রেলিয়ার কূটনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরীক্ষার একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে ধরা হচ্ছে।