প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা এবং তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্র। আধুনিক যুদ্ধবিমানসদৃশ একটি শক্তিশালী ড্রোন যৌথভাবে তৈরি ও সফলভাবে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে দুই দেশ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে তারা আর কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। এই ড্রোনটির নাম ‘মাইটি হর্নেট (IV)’, যা আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও এর আঘাতের সক্ষমতা ও কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বড়।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা সিটিতে ড্রোনটির পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন ও কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। পরীক্ষায় প্রত্যাশিত সব লক্ষ্য অর্জিত হওয়ায় প্রকল্পটিকে সফল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ক্র্যাটোস ডিফেন্স এবং তাইওয়ানের রাষ্ট্রীয় সামরিক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল চুং-শান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এনসিএসআইএসটি) যৌথভাবে এই ড্রোনটি তৈরি করেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু একটি নতুন অস্ত্রের সংযোজন নয়, বরং ভবিষ্যৎ যুদ্ধকৌশলের দিকনির্দেশনাও বহন করছে।
মাইটি হর্নেট (IV) মূলত একটি যুদ্ধবিমানসদৃশ ড্রোন, যা দূরপাল্লার আক্রমণে ব্যবহারের জন্য নকশা করা হয়েছে। এটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বিধ্বংসী হামলা চালাতে সক্ষম হলেও এর উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে যুদ্ধের সময় একসঙ্গে শত শত ড্রোন ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে। সামরিক ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘স্বর্ম অ্যাটাক’ বা ঝাঁকবদ্ধ আক্রমণ, যা আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
চীনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তাইওয়ানকে নতুন করে নিরাপত্তা ভাবনায় ফেলেছে। গত এক বছরে তাইওয়ানের আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চলে চীনা যুদ্ধবিমান ও ড্রোন প্রবেশের হার প্রায় ২৩ শতাংশ বেড়েছে। নিয়মিত এই ধরনের অনুপ্রবেশ শুধু সামরিক চাপই তৈরি করছে না, বরং তাইওয়ানের জনগণের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান বা বড় নৌযানের ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হবে। সে কারণেই তারা সাশ্রয়ী, দ্রুত উৎপাদনযোগ্য এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোনের দিকে ঝুঁকছেন।
এই প্রেক্ষাপটে মাইটি হর্নেট প্রকল্পটি তাইওয়ানের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির সামরিক গবেষকদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ফলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দ্রুত আত্মস্থ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে শুধু অস্ত্রের মান উন্নত হচ্ছে না, বরং স্থানীয় প্রতিরক্ষা শিল্পও শক্তিশালী হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই তাইওয়ান নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে, আর এই ড্রোন সেই লক্ষ্য পূরণে একটি বড় ধাপ।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্ব কম নয়। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তার নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। তাইওয়ানের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন তার মিত্রকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে তেমনি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কম খরচে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন ভবিষ্যতের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, বিশেষ করে যেখানে বড় ও দামি অস্ত্র সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
মাইটি হর্নেট (IV) শুধু আক্রমণাত্মক নয়, প্রতিরোধমূলক কৌশলেও কার্যকর হতে পারে। দূর থেকে শত্রুর সামরিক স্থাপনা, নৌযান বা বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানার সক্ষমতা থাকায় এটি একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ বার্তা দেয়। একই সঙ্গে ড্রোনটি মানববিহীন হওয়ায় পাইলটের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে না, যা আধুনিক যুদ্ধনীতিতে একটি বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ধরনের ড্রোনের সফল পরীক্ষা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামরিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। চীন ইতোমধ্যে নিজস্ব ড্রোন প্রযুক্তিতে অনেক দূর এগিয়েছে এবং নিয়মিত মহড়া ও পরীক্ষার মাধ্যমে তা প্রদর্শন করছে। তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই যৌথ উদ্যোগ সেই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই প্রযুক্তির গুরুত্ব রয়েছে। তাইওয়ানের সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ কাজ করছে, এমন প্রকল্প তাদের কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করতে পারে। সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বার্তাও দেয়—দেশটি একা নয়, আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে মাইটি হর্নেট (IV) শুধু একটি ড্রোন নয়, বরং তাইওয়ান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গভীরতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশল এবং ভবিষ্যৎ যুদ্ধের রূপরেখার প্রতিফলন। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও চাপের মুখে দাঁড়িয়ে এই প্রকল্প স্পষ্ট করে দিয়েছে, প্রযুক্তি ও সহযোগিতার মাধ্যমেই আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত হচ্ছে তাইওয়ান।