প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নির্বাচন এলেই শহর থেকে গ্রাম—সবখানে একসময় চোখে পড়ত রঙিন পোস্টারের ছড়াছড়ি। দেয়াল, বৈদ্যুতিক খুঁটি, দড়ি কিংবা গাছ—কোথাও ফাঁকা জায়গা থাকত না। পোস্টারের ছবি আর স্লোগানে ভরে যেত চারপাশ। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই পরিচিত দৃশ্য প্রায় নেই বললেই চলে। নির্বাচন কমিশনের কঠোর সিদ্ধান্তে এবার সব ধরনের পোস্টার পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ফলে নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। দৃশ্যমান পোস্টারের বদলে এখন চোখে পড়ছে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন, ফেসবুকের নিউজফিড আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রার্থীদের ব্যস্ত উপস্থিতি।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু পোস্টারমুক্তই নয়, বরং প্রচারণার ধরনেও এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। আগের নির্বাচনে রঙিন পোস্টার বন্ধ হলেও সাদাকালো পোস্টার কিংবা নানা বিকল্প উপায়ে দেয়াল দখলের প্রবণতা ছিল। এবার সেসবও নেই। ইসি কঠোর অবস্থান নেওয়ায় কিছু বিচ্ছিন্ন এলাকায় পোস্টারের অস্তিত্ব থাকলেও তা সীমিত পর্যায়ে রয়েছে এবং আগের মতো দৃষ্টিকটু পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
এই শূন্যস্থান পূরণ করেছে ডিজিটাল প্রচারণা। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক হয়ে উঠেছে নির্বাচনী প্রচারের প্রধান হাতিয়ার। নির্বাচন বিশ্লেষকদের ভাষায়, এবার ভোটের মাঠে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘পোস্টার’ হলো একটি ফেসবুক পোস্ট বা ভিডিও। প্রার্থীরা তাদের বক্তব্য, উন্নয়ন পরিকল্পনা কিংবা সমর্থকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য ফেসবুক লাইভ, পেইজ পোস্ট, রিলস ও শর্ট ভিডিওর ওপর বেশি নির্ভর করছেন। হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমেও প্রচারণা বাড়ছে।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের উপপ্রধান আমিনুল এহসান মনে করছেন, এই পরিবর্তন নির্বাচনী সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, মাইকিংয়ের ব্যবহার আগের তুলনায় কমেছে, যা শব্দদূষণ কমাতে সহায়ক। যদিও শহরের কিছু এলাকায় বিলবোর্ড চোখে পড়ছে, গ্রামগঞ্জে তার উপস্থিতি খুবই সীমিত। বরং ভোটের মাঠে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নজরে আসছে, তা হলো প্রার্থীদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়া। পোস্টার না থাকায় নিজেদের পরিচিত করতে প্রার্থীরা সরাসরি ভোটারের কাছে যাওয়ার কৌশল নিচ্ছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা এই পরিবর্তনকে সময়োপযোগী বলেই দেখছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ মনে করেন, অতীতে পোস্টার লেমিনেটিং করে ঝুলিয়ে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করা হতো। তারও আগে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগানো ছিল স্বাভাবিক চিত্র। এবার সেই চর্চা না থাকায় পরিবেশ ও নগর নান্দনিকতা দুটিই উপকৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রচারণার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতের নির্বাচনে আরও বিস্তৃত হবে বলেও তাঁর ধারণা।
এবার নির্বাচন কমিশন পোস্টারের বিকল্প হিসেবে সীমিত পরিসরে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। একজন প্রার্থী তাঁর নির্বাচনী এলাকায় নির্দিষ্ট মাপের সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছেন না অনেক প্রার্থী। বিলবোর্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর রহমানের অভিযোগ, অনেক প্রার্থী নামমাত্র বা দুর্বল কাঠামোর বিলবোর্ড বানিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এতে পেশাদার বিলবোর্ড ব্যবসায়ীরা যেমন প্রত্যাশিত লাভ পাচ্ছেন না, তেমনি শহরের কিছু এলাকায় অস্থায়ী কাঠামো নিয়ে নিরাপত্তার প্রশ্নও উঠছে। তবে এলইডি সাইন বা ডিজিটাল ডিসপ্লের ব্যবহার কিছুটা বেড়েছে, যা আধুনিক প্রচারণার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় প্রচারণার ব্যয় ও সমতার প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। ঢাকা-৪ আসনের এক স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমানের মতে, পরিবেশের জন্য এটি নিঃসন্দেহে ভালো সিদ্ধান্ত। তবে বিত্তশালী প্রার্থীরা ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ ব্যয় করে নানা কৌশলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কেউ কেউ ভোটারদের কাছে অডিও বার্তা পাঠাচ্ছেন, কেউ ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করছেন। এসবের জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়, যা সব প্রার্থীর পক্ষে সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ব্যানার ও হ্যান্ডবিলের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সমতার প্রশ্নও উঠছে।
ইসি অবশ্য বলছে, তাদের মূল লক্ষ্য প্রচারণাকে যতটা সম্ভব ইতিবাচক ও নিয়ন্ত্রিত রাখা। কমিশনের পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিকের ভাষায়, আচরণবিধি মানা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নজরদারি চলছে। এবারের নির্বাচনে এক প্রার্থী অন্য প্রার্থীর প্রচারণার সামগ্রীর ওপর নিজের প্রচারণা চালানোর অভিযোগও তুলনামূলকভাবে কম। এটিও একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ডিজিটাল প্রচারণার বিস্তৃতি চোখে পড়ার মতো। দেশে প্রায় সাড়ে সাত কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর একটি বড় অংশ কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনী আলোচনায় যুক্ত হচ্ছেন। কেউ প্রার্থীর পোস্টে লাইক দিচ্ছেন, কেউ শেয়ার করছেন, আবার কেউ মন্তব্যের মাধ্যমে সমর্থন বা সমালোচনা জানাচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমে এই সরব উপস্থিতি নির্বাচনী প্রচারণাকে যেমন গতিশীল করছে, তেমনি ভুল তথ্য ও অতিরঞ্জনের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া স্যাটেলাইট ও কেবল টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন, মোবাইল ফোনে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানোও এবারের প্রচারণার অংশ হয়ে উঠেছে।
মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, মাইকের ব্যবহার আগের তুলনায় কম। একসঙ্গে তিনটির বেশি মাইক্রোফোন ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেক প্রার্থী হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করছেন। এতে শব্দদূষণ কমেছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা সারোয়ার হোসেনের মতো অনেকেই বলছেন, আগের নির্বাচনে মাইকের উচ্চ শব্দে বিরক্তি হতো, এবার সেই সমস্যা অনেকটাই কম।
আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়ার প্রবণতা। আগে বড় নেতারা খুব কমই সরাসরি ভোটারের দরজায় যেতেন। এবার পরিস্থিতি বদলেছে। পোস্টারের অনুপস্থিতি এবং তরুণ প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ায় এই ধারা জোরদার হয়েছে। বড় দল ও অভিজ্ঞ প্রার্থীরাও এখন ভোটারের ঘরে যাচ্ছেন। নারীকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণও বেড়েছে। যদিও কোথাও কোথাও মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ব্যানার, ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিল এবার নতুন রূপে হাজির। পোস্টারের জায়গা দখল করেছে লিফলেট, যেখানে প্রার্থীরা তাদের পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার তুলে ধরছেন। এতে ভোটাররা সরাসরি প্রার্থীর কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে পারছেন বলে অনেকে মনে করছেন।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন শুধু ভোটের নয়, প্রচারণার সংস্কৃতিতেও বড় পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে বাংলাদেশ। পোস্টারমুক্ত পরিবেশ, ডিজিটাল প্রচারণার উত্থান এবং সরাসরি ভোটারের কাছে যাওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতের নির্বাচনে নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। এই পরিবর্তন কতটা টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, তা সময়ই বলে দেবে।