সুদানে হাসপাতালে হামলায় রক্তাক্ত মানবিক বিপর্যয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
সুদানে হাসপাতালে আরএসএফ হামলা

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে মানবিক সংকট আরও গভীর হলো দক্ষিণ কর্দোফান রাজ্যে একটি সামরিক হাসপাতালে প্রাণঘাতী হামলার মাধ্যমে। রাজ্যের আল-কুয়েইক সামরিক হাসপাতালে আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) বোমা হামলায় চারজন চিকিৎসাকর্মীসহ কমপক্ষে ২২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত আটজন। হতাহতদের মধ্যে রয়েছেন হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা। বার্তা সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে উঠে আসা এই তথ্য সুদানে চলমান সংঘাতে চিকিৎসা অবকাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।

সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আল-কুয়েইক সামরিক হাসপাতালে চালানো হামলাটি ছিল লক্ষ্যভিত্তিক এবং এতে হাসপাতালের কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টর এবং আরও তিনজন চিকিৎসাকর্মী রয়েছেন, যারা আহত ও অসুস্থ মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজ করছিলেন। নেটওয়ার্কটি এই হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, বেসামরিক নাগরিক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এই হামলা তার স্পষ্ট লঙ্ঘন।

দক্ষিণ কর্দোফান দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই অঞ্চলে সহিংসতা বেড়েছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অচল হয়ে পড়ছে। সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, আল-কুয়েইক হাসপাতালের ওপর হামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দক্ষিণ কর্দোফানজুড়ে ধারাবাহিক হামলার অংশ। এর ফলে একাধিক হাসপাতাল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, যা মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করছে।

চিকিৎসাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় হাসপাতালে আহত ও অসুস্থ রোগীরা চিকিৎসাধীন ছিলেন। বিস্ফোরণের পর হাসপাতালের ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেক রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিস্ফোরণের শব্দ কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা গেছে এবং আশপাশের এলাকায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।

সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক হামলার জন্য আরএসএফকে সম্পূর্ণভাবে দায়ী করেছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, চিকিৎসা স্থাপনা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা বন্ধ না হলে সুদানে মানবিক বিপর্যয় আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধের মধ্যেও চিকিৎসা সেবা একটি মৌলিক মানবাধিকার, যা রক্ষা করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্ব।

তবে এই অভিযোগের বিষয়ে আরএসএফের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। অতীতেও বিভিন্ন হামলার ক্ষেত্রে দায় স্বীকার বা অস্বীকার নিয়ে আরএসএফের অবস্থান অস্পষ্ট ছিল বলে উল্লেখ করেছেন পর্যবেক্ষকরা।

সুদানে ২০২৩ সাল থেকে চলমান সংঘাতে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা চরম চাপের মুখে পড়েছে। বহু হাসপাতাল ও ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেছে, চিকিৎসাকর্মীরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন, আর ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সুদানের লাখো মানুষ বর্তমানে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার বাইরে রয়েছে। শিশু, নারী ও বয়স্করা এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা স্থাপনার ওপর হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, সংঘাতের সময় হাসপাতাল ও চিকিৎসাকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। এই ধরনের হামলা শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানি ঘটায় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে পুরো একটি অঞ্চলের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগেও মানুষ মারা যেতে শুরু করে, যা মানবিক বিপর্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।

দক্ষিণ কর্দোফানের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও। তাদের মতে, হাসপাতাল লক্ষ্য করে হামলা চালানো একটি ভয়ংকর প্রবণতা তৈরি করছে, যা সংঘাতকে আরও নিষ্ঠুর করে তুলছে। সাধারণ মানুষ যখন চিকিৎসা পাওয়ার শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে ফেলে, তখন সংঘাতের ক্ষত আরও গভীর হয়।

আল-কুয়েইক সামরিক হাসপাতালের হামলার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক পরিবার আশঙ্কা করছে, আহত হলে বা অসুস্থ হলে তারা কোথায় চিকিৎসা পাবে। ইতোমধ্যে কিছু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছাড়তে শুরু করেছে বলে জানা গেছে, যা অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়াতে পারে।

সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য চিকিৎসা সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল নিন্দা নয়, বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা চায়, চিকিৎসা স্থাপনা সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হোক এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক। পাশাপাশি অবরুদ্ধ এলাকায় জরুরি চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছাতে মানবিক করিডোর নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে।

সব মিলিয়ে, দক্ষিণ কর্দোফানের আল-কুয়েইক সামরিক হাসপাতালে হামলা সুদানের চলমান সংঘাতে মানবিক আইনের ভয়াবহ অবমূল্যায়নের একটি নির্মম উদাহরণ। চিকিৎসাকর্মী ও রোগীদের রক্তে রঞ্জিত এই ঘটনা বিশ্বকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—যুদ্ধের মাঝেও মানবিকতার ন্যূনতম সীমা থাকা জরুরি। সেই সীমা বারবার লঙ্ঘিত হলে এর মূল্য চোকাতে হয় নিরীহ মানুষের জীবন দিয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত