প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ে আবারও প্রাণঘাতী রূপ নিল অবৈধ কয়লা খনন। ইস্ট জৈন্তিয়া পাহাড়ি জেলার দুর্গম থাঙ্কসু এলাকায় একটি অনুমোদনহীন কয়লা খনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ১৮ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও অন্তত আটজন শ্রমিক। আশঙ্কা করা হচ্ছে, খনির ভেতরে আরও কয়েকজন শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গোটা এলাকায় নেমে আসে শোক আর আতঙ্ক। পাহাড়ি জঙ্গলঘেরা এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্ধারকাজ চালানো যেমন কঠিন, তেমনি বিপজ্জনক। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিস্ফোরণের সময় খনির ভেতরে ঠিক কতজন শ্রমিক কাজ করছিলেন, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। খনিটি সম্পূর্ণ অবৈধ হওয়ায় শ্রমিকদের কোনো তালিকা বা খনির অভ্যন্তরীণ মানচিত্রও নেই, যা উদ্ধার তৎপরতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইস্ট জৈন্তিয়া পাহাড় জেলার পুলিশপ্রধান বিকাশ কুমার জানান, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, অবৈধভাবে কয়লা উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত ডিনামাইট থেকেই এই বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় খনির ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘন ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস জমে যায়। এতে অনেক শ্রমিক দগ্ধ হয়ে অথবা শ্বাসরোধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
ঘটনার পরপরই রাজ্য ও কেন্দ্রীয় উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, সরু কাঁচা রাস্তা এবং প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। জেলা পুলিশের আরেক কর্মকর্তা মনিষ কুমার জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর অন্ধকার ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। শুক্রবার সকাল থেকে আবারও অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এটি একটি অবৈধ ‘র্যাট-হোল’ খনি। এই পদ্ধতিতে খুব সরু ও গভীর সুড়ঙ্গ কেটে শ্রমিকরা নিচে নেমে কয়লা উত্তোলন করেন। সামান্য অসতর্কতা বা বিস্ফোরক ব্যবহারে ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। বিস্ফোরণের পর খনির ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় আটকে পড়া শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
পুলিশের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের অধিকাংশই দগ্ধ হয়ে অথবা খনির ভেতরে জমে থাকা ক্ষতিকর গ্যাসের কারণে শ্বাসরোধে মারা গেছেন। অনেক শ্রমিকের মরদেহ এমন অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা দুর্ঘটনার ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। খনিটির কোনো নকশা বা সঠিক তথ্য না থাকায় উদ্ধারকারীরা অনুমানের ভিত্তিতে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা। তিনি এক বিবৃতিতে নিহত শ্রমিকদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং অবৈধ কয়লা খননের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যারা এই অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে তিনি প্রশাসনকে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করার নির্দেশ দেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এই দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে ২ লাখ রুপি করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। আহতদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
মেঘালয়ে ‘র্যাট-হোল’ পদ্ধতিতে কয়লা খনন দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। পরিবেশগত ক্ষতি, পানিদূষণ এবং মানবজীবনের চরম ঝুঁকির কারণে ২০১৪ সাল থেকেই এই পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ভারতের জাতীয় পরিবেশ আদালত। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রশাসনের দুর্বল নজরদারি এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের মদদে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এখনো দেদারসে চলছে অবৈধ খনন।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, দারিদ্র্য আর কর্মসংস্থানের অভাবে বহু শ্রমিক প্রতিদিন মাত্র ১৮ থেকে ২৪ ডলার আয়ের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব অবৈধ খনিতে কাজ করতে বাধ্য হন। নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই, অপ্রশিক্ষিত অবস্থায় সংকীর্ণ সুড়ঙ্গে নেমে কাজ করা তাদের জন্য নিত্যদিনের বাস্তবতা। একটি দুর্ঘটনা যে কখন প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, তা তারা জেনেও বিকল্প পথের অভাবে এই ঝুঁকি মেনে নেন।
এর আগে ২০১৮ সালেও মেঘালয়ের একটি র্যাট-হোল খনিতে দুর্ঘটনায় ১৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা স্তিমিত হয়ে যায়। অবৈধ খনন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় আবারও একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল, যা প্রশাসনিক ব্যর্থতাকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এই দুর্ঘটনার পর ফের প্রশ্ন তুলেছে—কত প্রাণ গেলে অবৈধ কয়লা খননের এই অমানবিক চক্র বন্ধ হবে? তাদের মতে, শুধু শোকবার্তা বা ক্ষতিপূরণ নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। কঠোর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে।
মেঘালয়ের থাঙ্কসু এলাকার এই বিস্ফোরণ শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি অবহেলা, দারিদ্র্য এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। নিহত শ্রমিকদের পরিবারগুলো এখন প্রিয়জন হারানোর বেদনায় বিপর্যস্ত। তাদের চোখে শুধু প্রশ্ন—এই মৃত্যুর দায় কে নেবে, আর কবে থামবে এই অবৈধ খননের রক্তাক্ত অধ্যায়?