প্রকাশ: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন খাগড়াছড়ি জেলার ২৯৮ নম্বর সংসদীয় আসনের ২০৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৮৯টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৮টি কেন্দ্রকে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তালিকাভুক্ত করেছে। খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো তথ্য অনুযায়ী এসব কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
দুর্গম এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রে ভোটার এবং ভোট সামগ্রী পৌঁছানোর জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হবে। দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের সীমান্ত জনপদ নাড়াইছড়ি এবং লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নের ফুত্যাছড়ি ও শুকনাছড়ি কেন্দ্রে সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার অপরিহার্য। নির্বাচনী ব্যবস্থাপকরা জানিয়েছেন, সড়ক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে এসব কেন্দ্রের নিরাপদ ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করতে বিমান ব্যবস্থাপনা জরুরি।
নির্বাচন কমিশনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খাগড়াছড়ি আসনের ভোটকেন্দ্রগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে ১৪টি, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ১২১টি এবং অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ৬৮টি কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ও নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনা করে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে মোট ভোটার ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬২৬ জন। সদর উপজেলার ১৬টি কেন্দ্রে ৪০ হাজার ৪৮৬ জন, রামগড়ে ২৭ হাজার ৭৩১ জন, গুইমারায় ২৭ হাজার ২৬৪ জন, মানিকছড়িতে ২৩ হাজার ৩৮২ জন, মহালছড়িতে ২০ হাজার ৫৩৪ জন, মাটিরাঙায় ১৩ হাজার ৬৯৯ জন, দীঘিনালায় ১১ হাজার ১৮ জন, পানছড়িতে ৬ হাজার ৬৫৩ জন এবং লক্ষ্মীছড়িতে ২ হাজার ২৩৮ জন ভোটার রয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, পাহাড়বেষ্টিত এলাকা হওয়ায় অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে পৌঁছতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের নুনছড়ি কেন্দ্রের ভোটার অলকেশ চাকমা বলেন, ‘সমতল এলাকায় কেন্দ্র বেশি থাকলেও পাহাড় অঞ্চলে ভোটার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন। জীবন ও জীবিকার এই বাস্তবতা নির্বাচন কমিশন কখনো যথাযথভাবে বিবেচনা করে না।’ একই মত প্রকাশ করেছেন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গগন বিকাশ চাকমাও।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায় ভাইবোনছড়া, পেরাছড়া ও খাগড়াছড়ি ইউনিয়নের সব কেন্দ্রে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গোলাবাড়ি ইউনিয়নের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে ভোটকেন্দ্র মাত্র তিনটি থাকায় দিনশেষে ভোটারদের ভিড় ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। নির্বাচনী পরিবেশকে আরো সুবিধাজনক করতে কেন্দ্র বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নও সড়ক যোগাযোগের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন। বাসিন্দারা ফটিকছড়ির খিরাম-নানুপুর-নাজিরহাট-বিবিরহাট হয়ে যাতায়াত করেন। সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান নির্মল কান্তি চাকমা বলেন, ‘অনেক ভোটার একদিন আগে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছান। বয়স্ক, অসুস্থ বা প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য দিনের মধ্যে ভোট প্রদান প্রায় অসম্ভব।’ মাটিরাঙা উপজেলার সাপমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে চারটি ওয়ার্ডের ৩৫টি পাড়া থেকে ভোটাররা ভোট দেবেন, যাদের অধিকাংশই আদিবাসী ও নিম্নবিত্ত। ভোটার সুমি ত্রিপুরা বলেন, ‘আলুটিলা টুরিস্ট এলাকায় একটি ভোটকেন্দ্র থাকলে সুবিধা হতো।’
রামগড় পৌরসভার দশটি কেন্দ্রের মধ্যে আটটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। রামগড় প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক নিজামউদ্দিন লাভলু জানান, জনসংখ্যা, ভোটার উপস্থিতি এবং সীমান্তের কারণে কেন্দ্রগুলো সব সময়ই নিরাপদ। এখানে পর্যাপ্ত ভোটকেন্দ্র থাকায় ভোটহারও সাধারণত বেশি থাকে।
পাতাছড়া ইউনিয়নের পাঁচটি কেন্দ্রের মধ্যে দুটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। ভোটার নির্মল ত্রিপুরা জানান, কেন্দ্র সংখ্যা বাড়ালে ঝুঁকি কমত এবং ভোটদানের সুবিধা বৃদ্ধি পেত। সুজনের সাবেক সভাপতি প্রফেসর বোধিস্বত্ত দেওয়ান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূগোল, জনমিতি, বসতি এবং জীবনধারা বিবেচনা করে কেন্দ্র বিন্যাস জরুরি। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রথাগত নেতাদের সঙ্গে আগাম মতবিনিময়ের ওপর জোর দেন।
খাগড়াছড়ি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস এম শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘পুলিশের বিশেষ শাখা পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সুপারিশ ও প্রস্তাবনা নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ জেলা পুলিশ সুপার সায়েম মির্জা সায়েম মাহমুদ জানান, ‘প্রত্যেক কেন্দ্রে নির্ধারিত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন থাকবে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত সদস্য, টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হবে।’