ইংল্যান্ডে গৃহহীন শরণার্থীর সংখ্যা পাঁচ গুণ বৃদ্ধি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৭ বার
ইংল্যান্ডে গৃহহীন শরণার্থীর সংখ্যা পাঁচ গুণ বৃদ্ধি

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইংল্যান্ডে আশ্রয়প্রার্থী থেকে শরণার্থী হওয়া মানুষের জীবনে নতুন সংকট হিসেবে সামনে এসেছে গৃহহীনতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে শরণার্থী স্বীকৃতি পাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়লেও, তাদের আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় গৃহহীন বা গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত চার বছরে ইংল্যান্ডে এই সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে, যা দেশটির আশ্রয় ও আবাসন নীতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে ইংল্যান্ডে গৃহহীন বা গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শরণার্থী পরিবারের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৫৬০। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩১০-এ। অর্থাৎ স্বীকৃত শরণার্থীদের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাওয়ার পরপরই বাসস্থানের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন।

দাতব্য ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি; বরং এটি সরকারের আশ্রয় নীতির ‘সরাসরি ফল’। যুক্তরাজ্যে শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার পর একজন ব্যক্তিকে বা পরিবারকে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে দেওয়া হয় মাত্র ২৮ দিনের সময়। এই সময়ের মধ্যেই তাদের নতুন বাসস্থান খুঁজতে হয়, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হয় অথবা সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার জন্য আবেদন করতে হয়। বাস্তবতায় এই সময়সীমা অত্যন্ত অপ্রতুল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে আশ্রয় আবেদনের সিদ্ধান্ত দ্রুত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় শরণার্থী মর্যাদা পাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। তবে সেই সঙ্গে তাদের আবাসনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। অনেক শরণার্থী হঠাৎ করেই সরকারি সহায়তা হারিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই মানবিক সংকটের পেছনের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে ২৬ বছর বয়সী সুদানী তরুণী ইউসরার জীবনের গল্পে। সুদানে চলমান যুদ্ধ থেকে পালিয়ে তিনি ছোট একটি নৌকায় করে বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছান। দেশ ছাড়ার আগেই তার পরিবারের সবাই নিহত হন। যুক্তরাজ্যে পৌঁছে প্রায় পাঁচ মাস তিনি সরকার-নির্ধারিত এক আশ্রয় হোটেলে ছিলেন। গত বছরের আগস্টের শেষ দিকে শরণার্থী মর্যাদা পেলেও, সেই স্বীকৃতি তার জীবনে নিরাপত্তা আনতে পারেনি। বর্তমানে তিনি গ্রেটার ম্যানচেস্টারের রাস্তায় একটি তাঁবুতে রাত কাটাচ্ছেন।

ইউসরা জানান, রাতে তাঁবুতে থাকাটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। মাঝেমধ্যে মাতাল লোকজন তাঁবু খুলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন তিনি চিৎকার শুরু করেন। ভোর না হওয়া পর্যন্ত তার ঘুম আসে না। শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার আগেই তিনি স্থানীয় কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু একক প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় সামাজিক বাসস্থানের অপেক্ষমান তালিকায় তার অগ্রাধিকার কম। ফলে আইনি স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তিনি নিরাপদ আশ্রয় থেকে বঞ্চিত।

শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার পর ২৮ দিনের মধ্যে সরকারি আবাসন ছাড়ার নিয়মের পাশাপাশি আরও একটি কাঠামোগত সমস্যার কথা সামনে এসেছে। সরকার নিজেই স্বীকার করেছে, ইউনিভার্সাল ক্রেডিট নামের সামাজিক ভাতা পেতে গড়ে ৩৫ দিন সময় লাগে। ফলে অনেক শরণার্থী কোনো আয় বা ভাতার টাকা হাতে পাওয়ার আগেই সরকারি সহায়তা হারান। এই সময়টুকু তাদের জন্য কার্যত শূন্যতা তৈরি করে, যার ফল গৃহহীনতা।

জাতীয় গৃহহীনতা দাতব্য সংস্থা ‘ক্রাইসিস’-এর নীতি ও প্রচার প্রধান জ্যাসমিন বাসরান মনে করেন, বর্তমান ব্যবস্থাটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার ভাষায়, ২৮ দিন মোটেই যথেষ্ট সময় নয়। তিনি বলেন, শরণার্থীদের মধ্যে গৃহহীনতার হার এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারি পরিসংখ্যানে প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি উঠে আসে না, কারণ অনেক ঘটনা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানানোই হয় না।

এই সংকট এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাজ্যের আশ্রয় ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। আবেদন ও আপিলের বিশাল জট কমাতে লেবার সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। এতে একদিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক ফল দেখা গেলেও, অন্যদিকে আবাসন সংকট আরও তীব্র হয়েছে। স্বীকৃতি পাওয়া মানুষদের জন্য স্থায়ী বা অন্তর্বর্তী বাসস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় সংকট বহুগুণ বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার সমাধানে কেবল স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডাইভারসিটির পরিচালক জ্যাকুই ব্রডহেডের মতে, হোটেলনির্ভর বেসরকারি ব্যবস্থার বদলে সরকার যদি নিজস্ব অস্থায়ী আবাসনে বিনিয়োগ করে, তাহলে একদিকে আশ্রয় সংকট কমবে, অন্যদিকে সামগ্রিক আবাসন ঘাটতিও কিছুটা লাঘব হবে। তার মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবেও বেশি টেকসই সমাধান।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, তারা শরণার্থীদের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে নিজস্ব বাসস্থানে যেতে সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গৃহহীনতার ঝুঁকি কমাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করার কথাও জানানো হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইংল্যান্ডে গৃহহীন শরণার্থীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তা শুধু একটি আবাসন সমস্যা নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও মানবিক সংকেত। নিরাপদ আশ্রয় ছাড়া শরণার্থীদের কর্মসংস্থান, মানসিক সুস্থতা এবং সমাজে একীভূত হওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে এই সংকট অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব পড়বে পুরো সমাজের ওপরই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত