প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আগাম সাধারণ নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে জাপানের রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি প্রকাশ্য ও পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রতি। এমন এক সময়ে এই সমর্থন এলো, যখন জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে—রবিবারের নির্বাচনে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের খুব কাছাকাছি রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও প্রভাব বিবেচনায় ট্রাম্পের এই বক্তব্য শুধু জাপানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বৈশ্বিক কূটনীতিতেও বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত অক্টোবরে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সানায়ে তাকাইচি জাপানের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যতিক্রমী এক চরিত্র হিসেবে উঠে আসেন। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী—এই পরিচয় যেমন তাকে আলাদা করেছে, তেমনি তার দৃঢ় নেতৃত্ব ও স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান দ্রুতই জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) অভ্যন্তরীণ সংকট, মূল্যস্ফীতি ও গোপন তহবিল কেলেঙ্কারির কারণে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিল, তাকাইচির নেতৃত্বে সেই দলই নতুন প্রাণ ফিরে পায়। এই প্রেক্ষাপটেই আগাম নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি, যাতে বর্তমান জনসমর্থনকে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী সরকার গঠন করা যায়।
এএফপির টোকিও প্রতিনিধি জানায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তাকাইচিকে ‘শক্তিশালী, প্রভাবশালী ও প্রাজ্ঞ নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, তাকাইচি শুধু দক্ষ রাজনীতিবিদই নন, বরং তিনি সত্যিকার অর্থেই নিজের দেশকে ভালোবাসেন। একই পোস্টে ট্রাম্প জানান, আগামী ১৯ মার্চ জাপানের প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন। এই সফরকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান বাণিজ্য খাতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির দিকে এগোচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও জোরদার হচ্ছে। এসব উদ্যোগের প্রেক্ষিতে তিনি তাকাইচির প্রতি পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন ব্যক্ত করেন। তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি ও তার জোট যে কাজ করছে, তার জন্য তারা শক্তিশালী জনসমর্থনের স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বিদেশি নির্বাচনে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন না। কিন্তু ট্রাম্প এর আগেও এই রীতি ভেঙেছেন—আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে কিংবা হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের মতো নেতাদের প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে।
৬৪ বছর বয়সী সানায়ে তাকাইচি দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্পকে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল তার কূটনৈতিক কৌশলেরই অংশ। তিনি শুধু আমন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; ৭৯ বছর বয়সী ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য সমর্থনের কথাও প্রকাশ্যে বলেন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক জোরদার করতে গলফ-সম্পর্কিত একটি স্মারক উপহার দেন। এই ব্যক্তিগত সৌহার্দ্যই দুই নেতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
গত জুলাইয়ে দুই দেশের বাণিজ্য কর্মকর্তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছান। এই সমঝোতার ফলে জাপানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ২৫ শতাংশে বাড়ানোর হুমকি কমে ১৫ শতাংশে নেমে আসে। বিনিময়ে জাপান যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। এই চুক্তিকে তাকাইচির কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে, যা তার নির্বাচনী প্রচারণায় বড় শক্তি যোগাচ্ছে।
তবে তাকাইচির সময়কালে সবকিছুই যে মসৃণ ছিল, তা নয়। গত নভেম্বরে তিনি মন্তব্য করেন, চীন যদি স্বশাসিত তাইওয়ান দখলের চেষ্টা করে, তবে জাপান সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে। এই বক্তব্য বেইজিংয়ের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি, তবু নিরাপত্তা ইস্যুতে তাকাইচির কঠোর অবস্থান তার রক্ষণশীল সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।
গণতান্ত্রিক তাইওয়ান কখনোই চীনের শাসনের অধীনে ছিল না, তবে বেইজিং দ্বীপটিকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি ব্যবহারের হুমকিও দিয়ে যাচ্ছে। এই জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকাইচির স্পষ্ট অবস্থান জাপানের নিরাপত্তা নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত সাম্প্রতিক জরিপগুলো তাকাইচির বড় ধরনের বিজয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও কিছু অনিশ্চিত ভোটার এখনো রয়েছেন, তবু সামগ্রিক চিত্রে তার নেতৃত্বাধীন এলডিপির অবস্থান বেশ শক্ত। তরুণ ভোটারদের মধ্যেও তাকাইচির উল্লেখযোগ্য সমর্থন দেখা যাচ্ছে—যা জাপানের রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে বিরল, কারণ দীর্ঘদিন ধরে প্রবীণ ভোটাররাই এখানে প্রধান প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন।
টেম্পল ইউনিভার্সিটি জাপানের ইতিহাস ও এশীয় অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক জেফ কিংস্টন মনে করেন, আগাম নির্বাচনের ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাকাইচির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। তার মতে, শক্তিশালী জনসমর্থন বা এমনকি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে তাকাইচি উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ পাবেন। কিংস্টন আরও বলেন, একজন শক্তিশালী জনসমর্থন পাওয়া রক্ষণশীল নেতার বিজয় ট্রাম্প স্বাগত জানাবেন, কারণ তিনি বিজয়ীদের পছন্দ করেন এবং তাকাইচি প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
রবিবারের নিম্নকক্ষ নির্বাচনের আগে জরিপগুলো দেখাচ্ছে, এলডিপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজনীয় ২৩৩টিরও বেশি আসন অর্জন করতে পারে। শুক্রবার মাইনিচি শিম্বুন প্রকাশিত এক স্মার্টফোনভিত্তিক জরিপে বলা হয়েছে, ৪৬৫ আসনের সংসদে এলডিপি ৩০০টিরও বেশি আসন পেতে পারে। জোটসঙ্গী জাপান ইনোভেশন পার্টির আসন যোগ হলে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও অর্জন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং এলডিপির সাবেক জোটসঙ্গী কোমেইতো মিলে গঠিত নতুন সেন্ট্রিস্ট রিফর্ম অ্যালায়েন্স তাদের বর্তমান আসনের প্রায় অর্ধেক হারাতে পারে বলে বিভিন্ন জরিপে ইঙ্গিত মিলেছে। এই পরিস্থিতি তাকাইচির জন্য নির্বাচনী পথ আরও সুগম করছে।
তবে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা ও উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক নীতির কারণে আর্থিক বাজারে কিছুটা অস্থিরতাও দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি জাপানি সরকারি বন্ডের সুদের হার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং ইয়েনের বিনিময়মূল্যে ব্যাপক ওঠানামা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের বিপুল ঋণের বোঝা এবং তাকাইচির প্রস্তাবিত ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ও কর ছাড়ের প্রতিশ্রুতি বাজারের এই উদ্বেগের অন্যতম কারণ। তবে ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ সূর্য মনে করেন, তাকাইচি অতিরিক্ত রাজস্ব অপচয়ে যাবেন—এমন আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ নেই।
সব মিলিয়ে আগাম নির্বাচনের প্রাক্কালে সানায়ে তাকাইচি এখন শুধু জাপানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতেই নন, বরং আন্তর্জাতিক আলোচনারও অন্যতম প্রধান চরিত্র। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন তার জন্য বাড়তি রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে উঠেছে। রবিবারের ভোটই এখন নির্ধারণ করবে—এই সমর্থন ও জনমত কতটা শক্তিশালী সরকারে রূপ নেয়।