নির্বাচনী ব্যস্ততায় ঢিল, মাদক কারবারিদের নতুন তৎপরতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৫ বার
নির্বাচনী ব্যস্ততায় ঢিল, মাদক কারবারিদের নতুন তৎপরতা

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন ব্যস্ত সময় পার করছে, তখন সেই সুযোগ কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে উঠেছে দেশের মাদক কারবারি চক্র। নির্বাচনী ডামাডোল, মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং প্রশাসনিক ব্যস্ততার ফাঁক গলে একের পর এক মাদকের চালান দেশে প্রবেশ করছে। শুধু পুরোনো পথেই নয়, নতুন কৌশল ও আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে মাদক ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) ও অন্যান্য বাহিনীর অভিযানে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। ইয়াবা, গাঁজা বা ফেনসিডিলের মতো পরিচিত মাদকের পাশাপাশি দেশে প্রবেশ করছে নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক। বিশেষ করে ই-সিগারেট বা ভ্যাপের কার্টিজের ভেতরে তরল মাদকের ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে মাদক কারবারে। আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর মিরপুরে ডিএনসির একটি অভিযানে এই ভয়ংকর প্রবণতার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

সেদিন এক যুবককে বাইসাইকেলসহ আটক করা হয়। তার ব্যাগ তল্লাশি করে উদ্ধার করা হয় দুটি ভ্যাপ কার্টিজ। পরে আটক যুবক মেহেদী হাসান রাকিবকে নিয়ে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে আরও তিনটি কার্টিজ উদ্ধার করা হয়। মোট পাঁচটি কার্টিজে পাওয়া যায় প্রায় ৩৪০ মিলিলিটার তরল মাদক, যা পরীক্ষায় শনাক্ত হয় নতুন ধরনের এমডিএমবি। তদন্তে জানা গেছে, এই মাদক এসেছে মালয়েশিয়া থেকে এবং অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে দেশে ঢোকানো হয়েছে। ভ্যাপ বা ই-সিগারেটের আড়ালে তরুণ সমাজকে লক্ষ্য করে এই মাদক ছড়ানো হচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নির্বাচনী সময়ের এই সুযোগ শুধু রাজধানীতেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজে লাগাচ্ছে মাদক চক্র। গত ১১ জানুয়ারি রংপুরে ভেজাল মদ বা রেক্টিফাইড স্পিরিট পান করে একে একে সাতজনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় পুরো দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, গাজীপুরের একটি কারখানায় অবৈধভাবে এই মদ তৈরি করা হয়েছিল। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২ হাজার ২৭৮ লিটার রেক্টিফাইড স্পিরিটসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গাজীপুরেই শেষ নয়। রাজধানীর অভিজাত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটেও সন্ধান মেলে অবৈধ মদের কারখানার। সেখানে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় প্রায় ২ হাজার লিটার দেশি ও বিদেশি মদ। আবাসিক এলাকায় এমন অবৈধ কারখানার অস্তিত্ব প্রমাণ করে, মাদক কারবারিরা কতটা সাহসী হয়ে উঠেছে এবং কীভাবে তারা প্রশাসনিক নজরদারির বাইরে থেকে কাজ চালাচ্ছে।

ইয়াবা পাচারের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে অভিনব কৌশল। গত ৩ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারগামী একটি স্লিপার কোচ বাসে তল্লাশি চালিয়ে বাসের সিটের নিচে লুকানো বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। একই দিনে রাজধানীর উত্তরাতেও পৃথক অভিযানে জব্দ হয় আরেকটি বড় চালান। এই দুই অভিযানে প্রায় ৭০ হাজার পিস ইয়াবাসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচন ঘিরে যাত্রী চলাচল ও যানবাহনের চাপ বাড়ায় মাদক চক্র এই সুযোগ নিতে চায়।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে মাদক পাচারের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা সব সময়ই নতুন সুযোগ খোঁজে। তাঁর মতে, নির্বাচন এমন একটি সময়, যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় একটি অংশ নির্বাচনী দায়িত্বে ব্যস্ত থাকে। ফলে অন্য অপরাধ দমনে মনোযোগ কিছুটা হলেও বিভক্ত হয়। এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে মাদক চক্র তৎপরতা বাড়ায়। তিনি আরও বলেন, এই সময়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নিজস্ব কার্যক্রম আরও জোরদার হওয়া জরুরি, পাশাপাশি নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর অবশ্য এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন। ডিএনসির পরিচালক (অপারেশন) মো. বশির আহমেদ জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে সারা দেশে ৪ হাজার ৯১টি মামলা হয়েছে এবং মাদক সংশ্লিষ্টতায় ৪ হাজার ২৯৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে প্রায় ১ হাজার কেজি গাঁজা, ৬ লাখের বেশি ইয়াবা এবং নতুন ধরনের এমডিএমবিসহ বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকলেও মাদক ইস্যুতে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। মাদক চক্র যেন এই সুযোগে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে, সে জন্য ডিএনসির সব অফিস সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

ডিএনসির অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় আরও জানা গেছে, গত ৬ জানুয়ারি থেকে বাহিনীর সব সদস্যের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চলবে। সীমান্ত এলাকা, মহাসড়ক, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন এবং বিমানবন্দরগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি নতুন মাদক শনাক্ত ও বিশ্লেষণের জন্য ল্যাব কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি একটি বড় সামাজিক সংকট। নির্বাচনী সময়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে যদি মাদক চক্র শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে, তবে তা তরুণ সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই নির্বাচন নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি মাদকবিরোধী লড়াইয়েও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, নির্বাচন ঘিরে দেশের ব্যস্ততা যত বাড়ছে, ততই মাদক কারবারিরা নতুন নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সাফল্য থাকলেও চ্যালেঞ্জও কম নয়। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের কঠোরতা, সামাজিক সচেতনতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগই পারে নির্বাচনী ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠা মাদক চক্রের লাগাম টানতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত