জাতীয় নির্বাচনে দোকান বন্ধ: ভোটে উৎসাহ ও প্রস্তুতির বার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৩ বার
জাতীয় নির্বাচনে দোকান বন্ধ: ভোটে উৎসাহ ও প্রস্তুতির বার্তা

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে যখন রাজনৈতিক তৎপরতা, প্রচার-প্রচারণা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এলো ব্যবসায়ী মহল থেকে। আগামী ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি—বুধবার ও বৃহস্পতিবার—ঢাকাসহ সারা দেশের সব দোকান, বাণিজ্য বিতান ও শপিংমল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি। ভোটাধিকার প্রয়োগে নাগরিকদের সর্বোচ্চ সুযোগ নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল হাসান মাহমুদের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও গণভোট। এ উপলক্ষে সরকারি সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ দেশের সব দোকান, বিপণীবিতান ও শপিংমল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি ও ঢাকা মহানগর দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির স্ট্যান্ডিং কমিটির এক যৌথ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় উপস্থিত নেতারা মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে ব্যবসায়ী সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। ভোটের দিন এবং তার আগের দিন দোকানপাট বন্ধ থাকলে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন এবং নির্বাচনী পরিবেশ আরও শান্তিপূর্ণ থাকবে।

এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন সরকারও নির্বাচন উপলক্ষে একাধিক ছুটির ঘোষণা দিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দিন ১১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। পাশাপাশি দেশের কারখানাগুলোর শ্রমিকদের জন্য ১০ ফেব্রুয়ারি ছুটির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি তো এমনিতেই সাধারণ ছুটি হিসেবে নির্ধারিত থাকে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই একাধিক দিনের ছুটির মধ্য দিয়ে নির্বাচনকে ঘিরে একটি স্বতন্ত্র পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দোকান ও বিপণীবিতান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত শুধু একটি আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি একটি প্রতীকী বার্তা বহন করে। ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে এমন সিদ্ধান্ত ভোটাধিকারকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে। অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচনের দিন দোকানপাট খোলা থাকলে অনেক কর্মজীবী মানুষ ভোট দিতে আগ্রহী হলেও সময়ের অভাবে বা কর্মস্থলের চাপে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন না। এবার সেই বাধা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঢাকার পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে বড় শপিংমল, মার্কেট ও বিপণীবিতান বন্ধ থাকলে শহুরে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে পোশাক, ইলেকট্রনিকস, মুদি ও খুচরা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য কর্মচারী রয়েছেন, যাঁরা সাধারণ দিনে দোকান খোলা থাকলে ভোট দিতে যেতে সমস্যায় পড়েন। দোকান বন্ধ থাকায় তাঁরা পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন।

তবে ব্যবসায়ী মহলের ভেতরেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন, টানা দুই দিন দোকান বন্ধ রাখায় আর্থিকভাবে কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে, বিশেষ করে যাঁরা দৈনিক বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। আবার অনেকে বলছেন, জাতীয় নির্বাচন পাঁচ বছর পরপর আসে; এ ধরনের একটি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সাময়িক ক্ষতি মেনে নেওয়াই দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয়। তাছাড়া সরকার ঘোষিত ছুটি ও সার্বিক পরিবেশ বিবেচনায় দোকান খোলা রাখলেও ক্রেতা সমাগম স্বাভাবিকের তুলনায় কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ব্যবসায়ীদের আর্থিক বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের গুরুত্বের কাছে সাময়িক আর্থিক ক্ষতি গৌণ বলেই তারা মনে করেন। সমিতির এক নেতা বলেন, “আমরা সবাই এই দেশের নাগরিক। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। ব্যবসায়ী সমাজ যদি এই সময়ে এক ধাপ এগিয়ে আসে, তাহলে সেটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেবে।”

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সারাদেশে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে। ভোটের দিন ও তার আগের দিনগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনী মাঠে থাকবে। দোকান ও বিপণীবিতান বন্ধ থাকলে জনসমাগম কম থাকবে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়ও সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোই এখন নির্বাচন কমিশন ও সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। দোকানপাট বন্ধ রাখা, সাধারণ ছুটি ঘোষণা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় বিশেষ নজর—এই সবকিছু মিলিয়ে ভোটারদের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। এর ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের হার বাড়বে এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়তে পারে।

এদিকে সাধারণ ভোটারদের অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিশেষ করে শহরের কর্মজীবী মানুষদের মধ্যে সন্তোষ দেখা যাচ্ছে। তাঁদের মতে, দোকান ও শপিংমল বন্ধ থাকলে পরিবার নিয়ে ভোট দিতে যাওয়া সহজ হবে। কেউ কেউ আবার বলছেন, নির্বাচনের দিন শহর কিছুটা ফাঁকা থাকলে ভোটকেন্দ্রে যাতায়াতও স্বস্তিদায়ক হবে।

সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির এই সিদ্ধান্ত দেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি দেখাচ্ছে যে, নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক দল বা সরকারের বিষয় নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই একটি নির্বাচন অর্থবহ ও সফল হয়ে ওঠে। এখন দেখার বিষয়, এই সিদ্ধান্ত ভোটার উপস্থিতি ও সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশে কী ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত