হার্ভার্ডের সঙ্গে সব একাডেমিক সম্পর্ক ছিন্ন করল পেন্টাগন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৮ বার
হার্ভার্ডের সঙ্গে সব একাডেমিক সম্পর্ক ছিন্ন করল পেন্টাগন

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন দেশটির অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সব ধরনের সামরিক শিক্ষা ও একাডেমিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে সামরিক প্রশিক্ষণ, উচ্চপর্যায়ের ফেলোশিপ, গবেষণা সহযোগিতা এবং বিভিন্ন সার্টিফিকেট ও স্বল্পমেয়াদি কোর্সে হার্ভার্ডের সঙ্গে পেন্টাগনের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ও সামরিক নীতির ক্ষেত্রে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, শুক্রবার পেন্টাগনের পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে এমন কিছু মতাদর্শ ও নীতির চর্চা করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কৌশলগত লক্ষ্য, শৃঙ্খলা ও কার্যকর নেতৃত্ব তৈরির দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ‘ওক’ বা অতি-উদারপন্থী আদর্শের প্রভাব বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছে পেন্টাগন।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ বিষয়ে কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা আমাদের সেরা সামরিক কর্মকর্তাদের হার্ভার্ডে পাঠিয়েছি। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, এই প্রতিষ্ঠান আমাদের লড়াকু সৈনিক ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোকে গুরুত্ব দেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেকেই সেখানে গিয়ে এমন এক বিশ্বায়িত ও আদর্শিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে ফিরে আসছেন, যা বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র বা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে খুব বেশি কার্যকর নয়।’

পেন্টাগনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে হার্ভার্ডের সঙ্গে সব ধরনের আনুষ্ঠানিক একাডেমিক ও সামরিক শিক্ষা সম্পর্ক বন্ধ হয়ে যাবে। তবে বর্তমানে যারা হার্ভার্ডে অধ্যয়নরত সামরিক কর্মকর্তা বা পেন্টাগনের স্পনসরশিপপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী, তারা তাদের চলমান কোর্স সম্পন্ন করার সুযোগ পাবেন। নতুন করে কোনো কর্মকর্তা বা শিক্ষার্থীকে হার্ভার্ডে পাঠানো হবে না।

এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ ইঙ্গিত দিয়েছেন, শুধু হার্ভার্ড নয়—অন্য আইভি লিগ ও বেসরকারি অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও সামরিক শিক্ষা সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘হার্ভার্ড আজ ওক—অতি-উদারপন্থী, কিন্তু পেন্টাগন তা নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো যাচাই করা, কোন প্রতিষ্ঠান সত্যিকার অর্থে আমাদের সেনাবাহিনীর জন্য কার্যকর, বাস্তবভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছে।’

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ নিজেও আইভি লিগের ছাত্র ছিলেন। তিনি প্রিন্সটন ও হার্ভার্ড—উভয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি হার্ভার্ডের নীতিগত অবস্থান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কঠোর সমালোচক হয়ে উঠেছেন। এমনকি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে তিনি তার হার্ভার্ড ডিগ্রি ফেরত পাঠিয়েছেন, যদিও বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকেই হার্ভার্ডসহ শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে ‘বামপন্থী আধিপত্য’ ও মতপ্রকাশের ভারসাম্যহীনতার অভিযোগ উঠে আসছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে হার্ভার্ডসহ বিভিন্ন কলেজ ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়ায়। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, এসব বিক্ষোভের সময় ইহুদি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যর্থ হয়েছে। এই ইস্যুতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি এবং বড় অঙ্কের জরিমানার দাবিও তোলা হয়।

এর আগেও হার্ভার্ডের ওপর আর্থিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়েছিল। ট্রাম্প একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রায় ২৬০ কোটি ডলারের সরকারি অনুদান কমিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা ও ভর্তি নীতিতে কড়াকড়ি আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যদিও হার্ভার্ডের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় এক-চতুর্থাংশই বিদেশি।

পেন্টাগনের এই সিদ্ধান্তে একাডেমিক স্বাধীনতার পক্ষে থাকা মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক মনে করছেন, সামরিক বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার সহযোগিতা শুধু প্রশিক্ষণের জন্য নয়, বরং কৌশলগত গবেষণা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হার্ভার্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন, সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন বাস্তবমুখী, শৃঙ্খলাভিত্তিক ও জাতীয় নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক শিক্ষা। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান সেই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয় বা আদর্শিকভাবে বিপরীতমুখী অবস্থান নেয়, তাহলে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করা যুক্তিসঙ্গত।

সব মিলিয়ে, হার্ভার্ড ও পেন্টাগনের মধ্যকার এই বিচ্ছেদ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের ঘটনা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা, রাজনীতি ও সামরিক দর্শনের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যের প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। আগামী দিনে অন্যান্য আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও পেন্টাগন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে দেশটির নীতি-নির্ধারক ও শিক্ষাবিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত