প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়ন, নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হওয়া মানুষের ত্যাগ আর অবহেলায় ফেলে রাখা যাবে না। এবারকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; এই নির্বাচন হবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ। ক্ষমতায় গেলে কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়, জনগণের সামনে দেওয়া অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বড় মাঠে জেলা বিএনপির আয়োজনে এক নির্বাচনী সমাবেশে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। শীতের দুপুরেও মাঠজুড়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ঢল ছিল চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘদিন পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা ঘিরে মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা সমাবেশের পরিবেশেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তারেক রহমান বলেন, গত এক যুগ ধরে বাংলাদেশের মানুষ তাদের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ভোট দেওয়ার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের সুযোগ—সবকিছুই সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষ পিছিয়ে গেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং আয়-বৈষম্য দেশের মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের তরুণদের জন্য যে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন হয়নি; কৃষক, শ্রমিক ও নারীদের ন্যায্য মর্যাদা ও সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বিগত সরকার।
তিনি বলেন, আজ সময় এসেছে এই অবস্থা পরিবর্তনের। আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে জনগণ শুধু প্রতিনিধি নির্বাচন করবে না, বরং একটি নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিতও রচনা করবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেওয়া প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। তার ভাষায়, “আমরা শুধু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না; আমরা দায়িত্ব নিতে চাই এবং সেই দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিয়েই নির্বাচনে এসেছি।”
নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত না করতে পারলে দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা হয়েছিল, যার সুফল আজও দেশ পাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চায়। তিনি জানান, প্রতিটি গৃহিণীর কাছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে তারা সংসার পরিচালনায় বাড়তি নিরাপত্তা পান।
কৃষকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের খাদ্যনিরাপত্তার মূল শক্তি এই কৃষকরাই। তাদের যথাযথ সহায়তা ছাড়া দেশ এগোতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ চালু করা হবে, যার মাধ্যমে তারা সহজ শর্তে ঋণ, সার ও বীজ পাবে। তিনি ঘোষণা দেন, ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচিত করলে সারা দেশে কৃষকদের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করা হবে। পাশাপাশি জেলে, কৃষক ও শ্রমিকরা রেজিস্টারকৃত এনজিও থেকে যে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে সেই ঋণ পরিশোধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ঋণের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পায়।
ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও পঞ্চগড়কে কৃষিপ্রধান এলাকা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এই অঞ্চলের মানুষের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করা জরুরি। শুধু কৃষিতে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃষিনির্ভর শিল্প ও প্রকল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে চায় বিএনপি। এতে করে তরুণদের আর কাজের সন্ধানে এলাকা ছাড়তে হবে না, বরং নিজ অঞ্চলেই তারা ভবিষ্যৎ গড়তে পারবে।
তিনি আরও বলেন, গত এক যুগ ধরে মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে সেই অধিকার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজে হাত দেওয়া। বিএনপির লক্ষ্য দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারেক রহমান জানান, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও এলাকায় চা কারখানা ও শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ঠাকুরগাঁওয়ে ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নে চেষ্টা করা হবে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণ, যুবকদের জন্য আইটি পার্ক বা আইটি হাব গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ে একটি মেডিকেল কলেজ এবং একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান।
স্বাস্থ্যসেবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায্য চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ‘হেলথ কেয়ারার’ বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যারা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা পৌঁছে দেবে। একই সঙ্গে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে বিমানবন্দর চালুর প্রতিশ্রুতি দেন, যা এই অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়াবে।
তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, ধর্ম বা বর্ণের ভিত্তিতে কোনো বিচার করা হবে না। যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। তার মতে, ধানের শীষের প্রার্থীরা বিজয়ী হলে তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে জনগণের পাশে থাকা এবং তাদের সমস্যার সমাধানে কাজ করা।
সমাবেশ শেষে নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ লক্ষ্য করা যায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি—এই দুই মিলেই তারেক রহমানের বক্তব্য সমাবেশে উপস্থিত মানুষের মনে বিশেষ আলোড়ন তোলে।