এপস্টেইন নথিতে ইউরোপ কাঁপছে, ক্ষমতার মসনদে ফাটল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৭ বার
এপস্টেইন নথিতে ইউরোপ কাঁপছে, ক্ষমতার মসনদে ফাটল

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত অর্থলগ্নিকার ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কিত নথি প্রকাশের পর ইউরোপজুড়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ভূমিকম্প। পদত্যাগের চাপ, তলব, দুর্নীতি তদন্ত ও নেতৃত্ব সংকট—সব মিলিয়ে একের পর এক দেশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও ফ্রান্সে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নাম উঠে আসায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার স্বচ্ছতা। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, এপস্টেইন নথি এখন আর কেবল অতীতের একটি অপরাধকাহিনি নয়; এটি ইউরোপীয় রাজনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎকেও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সবচেয়ে বড় চাপের মুখে পড়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। এপস্টেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্টারমারের নেতৃত্বকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং সরকারি গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর লেবার পার্টির ভেতরেই শুরু হয়েছে তীব্র ক্ষোভ। সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিচারবুদ্ধি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী সংস্থা ইউরেশিয়া গ্রুপ জানিয়েছে, চলতি বছরেই কিয়ার স্টারমারের ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। যদিও স্টারমার দাবি করেছেন, পিটার ম্যান্ডেলসন তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এবং তিনি সব তথ্য জানতেন না, তবু এই ব্যাখ্যা দলের ভেতরের অসন্তোষ প্রশমিত করতে পারেনি। মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় নির্বাচনের পর তাঁর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ আসতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

এই কেলেঙ্কারির ধারাবাহিকতায় লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী লবিং প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল কাউন্সিল’-এর প্রধান নির্বাহী বেঞ্জামিন ওয়েগ-প্রসার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এপস্টেইন নথিতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে দণ্ডিত ওই অপরাধীর যোগাযোগের তথ্য উঠে আসার পর নৈতিক দায় স্বীকার করেই তিনি সরে দাঁড়ান। ব্রিটেনে এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এপস্টেইন কাণ্ড কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক লবিং ও ক্ষমতার অলিন্দে নৈতিকতার বড় সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।

অন্যদিকে, নরওয়েতে এই নথি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী থর্বজর্ন জ্যাগল্যান্ডের বিরুদ্ধে ‘গুরুতর দুর্নীতির’ অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে বিশেষ পুলিশ ইউনিট। ৭৫ বছর বয়সী এই প্রভাবশালী রাজনীতিক একসময় নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান এবং কাউন্সিল অব ইউরোপের মহাসচিব ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে উপহার, ভ্রমণ সুবিধা এবং আর্থিক ঋণ গ্রহণ করেছেন।

তদন্তের স্বার্থে জ্যাগল্যান্ডের কূটনৈতিক দায়মুক্তি প্রত্যাহারের জন্য নরওয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে। নরওয়ের ইতিহাসে এত উচ্চপর্যায়ের সাবেক নেতার বিরুদ্ধে এমন তদন্ত বিরল ঘটনা। জ্যাগল্যান্ডের আইনজীবী অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁর মক্কেল নির্দোষ এবং তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। তবু সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—যিনি আন্তর্জাতিক নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে নোবেল কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধেই যদি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তবে ক্ষমতাবানদের জবাবদিহি কোথায়?

ফ্রান্সেও এই নথির অভিঘাত কম নয়। দেশটির সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী জ্যাক ল্যাংকে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বর্তমানে তিনি প্যারিসের প্রভাবশালী ‘আরব ওয়ার্ল্ড ইনস্টিটিউট’-এর সভাপতি। প্রকাশিত নথিতে জ্যাক ল্যাংয়ের নাম ৬০০ বারের বেশি উঠে এসেছে, যা ফরাসি রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, এপস্টেইনের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সফরে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন।

ফরাসি সরকার এখন বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক নয়, কূটনৈতিক মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবেও দেখছে। কারণ, ল্যাংয়ের বর্তমান দায়িত্ব আন্তর্জাতিক পরিসরে ফ্রান্সের ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এপস্টেইন নথিতে তাঁর নাম এতবার উঠে আসায় স্বাভাবিকভাবেই ফরাসি নাগরিক সমাজে প্রশ্ন উঠেছে—এই সম্পর্কগুলো কতটা নৈতিক ছিল এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এপস্টেইন কাণ্ড ইউরোপের রাজনৈতিক কাঠামোর একটি গভীর সমস্যা উন্মোচন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে ব্যবসা, লবিং এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের যে অদৃশ্য সেতু তৈরি হয়েছিল, এই নথি তা নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন আর শুধু পদত্যাগে সন্তুষ্ট নয়; তারা চায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন সম্পর্ক ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা।

একই সঙ্গে এই সংকট গণতন্ত্রের জন্য এক বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক নেতারা বারবার স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার কথা বললেও বাস্তবে ক্ষমতার অলিন্দে কী ঘটে, এপস্টেইন নথি তা প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন আলোচনা চলছে—এই ঘটনা কি কেবল কয়েকজন ব্যক্তির পতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি রাজনৈতিক সংস্কারের নতুন ঢেউ তৈরি করবে?

সব মিলিয়ে বলা যায়, জেফরি এপস্টেইনের নাম ইউরোপীয় রাজনীতিতে এখন শুধু একটি অপরাধী পরিচয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহির এক প্রতীক। আগামী দিনগুলোতে এই কেলেঙ্কারি আরও কত দূর গড়ায় এবং কতজনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এতে প্রভাবিত হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে ইউরোপসহ গোটা বিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত