রাজশাহীর ছয় আসনে বিএনপি-জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গ্রামের চা-স্টল থেকে শুরু করে হাটবাজার, পাড়ার বৈঠকখানা কিংবা শহরের মোড়ের আড্ডা— রাজশাহীর সর্বত্র এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর এই বিভাগের ছয়টি সংসদীয় আসনে যে নির্বাচনি উত্তাপ ও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে, তা সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে। মাঠ পর্যায়ের প্রচার, দলীয় তৎপরতা এবং ভোটারদের কথাবার্তা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হচ্ছে, রাজশাহীর সব আসনেই এবারের নির্বাচন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে রূপ নিতে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবার রাজশাহীতে নির্বাচনি সমীকরণ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জটিল। বিএনপির শক্ত ঐতিহাসিক ভোটব্যাংক যেমন এখনো বিদ্যমান, তেমনি দীর্ঘ বিরতির পর জামায়াতে ইসলামীও সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসীভাবে মাঠে নেমেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিদ্রোহী প্রার্থী, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটারদের সম্ভাব্য অবস্থান। সব মিলিয়ে ছয়টি আসনেই ফলাফল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চিত থাকছে।

রাজশাহী-১ তানোর-গোদাগাড়ী আসনে লড়াইয়ের উত্তাপ সবচেয়ে বেশি। বিএনপির প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী মরহুম ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভাই মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত শরিফ উদ্দিন। তার বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। দুজনই অভিজ্ঞ ও পরিচিত মুখ হওয়ায় ভোটের মাঠে এই আসনটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে থাকলেও এবি পার্টির ড. আব্দুর রহমান এবং গণঅধিকার পরিষদের মীর মো. শাহজাহান আলোচনায় আছেন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ থাকবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই। জামায়াত প্রার্থীর সাবেক এমপি পরিচিতি তাকে কিছুটা এগিয়ে রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজশাহী-২ সদর আসনে নগরকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রভাব স্পষ্ট। এখানে বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু এবং জামায়াতের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরসহ ছয় প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। নগর এলাকায় নারী ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এই ভোটারদের লক্ষ্য করে দুদলের প্রার্থীই আলাদা কৌশলে প্রচার চালাচ্ছেন। নারী ভোটারদের নিরাপত্তা, নাগরিক সুবিধা এবং সামাজিক সেবার প্রতিশ্রুতি এখানে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সদর আসনেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই মূল লড়াই হবে।

রাজশাহী-৩ পবা-মোহনপুর আসনে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি নির্বাচনি প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিএনপির অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন এবং জামায়াতের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ এখানে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, সরাসরি মতবিনিময় সভা এবং তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে বক্তব্য এই আসনে বড় প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় ভোটারদের মতে, তরুণদের ভোট যে দিকে যাবে, ফলাফল অনেকটাই সেদিকেই ঝুঁকবে।

রাজশাহী-৪ বাগমারা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলকভাবে আরও সূক্ষ্ম। বিএনপির উপজেলা আহ্বায়ক ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়া এবং জামায়াতের ডা. আব্দুল বারী সরদার ছাড়াও আরও দুই প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। এখানে নারী ভোটারদের সংখ্যা প্রায় পুরুষের সমান হওয়ায় তাদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্থানীয়দের মতে, চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত হওয়ায় ডা. বারী সরদার নারীদের কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য, যা তাকে কিছুটা এগিয়ে দিতে পারে।

রাজশাহী-৫ পুঠিয়া-দুর্গাপুর আসনে বিএনপির অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল এবং জামায়াতের মনজুর রহমানের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তবে এই আসনে বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াত প্রার্থী এগিয়ে যেতে পারেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো মনে করছে। তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সভা, সমাবেশ ও মাইকিং বাড়ানো হয়েছে, যা নির্বাচনি মাঠকে আরও সরগরম করে তুলেছে।

রাজশাহী-৬ বাঘা-চারঘাট আসনে বিএনপির জেলা আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ এবং জামায়াতের অধ্যক্ষ নাজমুল হকের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই স্পষ্ট। নারী ও তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে দুই পক্ষই জোরালো প্রচার চালাচ্ছেন। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, সংগঠনের মাঠপর্যায়ের শক্তিই এখানে চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে।

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে নানা মত উঠে আসছে। মোহনপুর উপজেলার কৃষক জিয়াউর রহমান বলেন, আগে কোন দিকে বাতাস বইছে তা বোঝা যেত, এবার তা স্পষ্ট নয়। সবাই মাঠে থাকলেও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটাররা কোন দিকে যাবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। গোদাগাড়ীর কলেজছাত্রী রুমানা আক্তার জানান, জামায়াত এবার খুব গুছিয়ে প্রচার চালাচ্ছে, তবে বিএনপির শক্ত ভোটব্যাংকও অটুট রয়েছে। বাগমারার ব্যবসায়ী রাজ্জাকুল ইসলাম মনে করেন, এবার ভোট খুব জমজমাট হবে, কিন্তু ফলাফল আগেভাগে বলা কঠিন।

পবা উপজেলার গৃহিণী মমতাজ বেগম বলেন, মানুষ এবার নতুন নেতৃত্ব ও বাস্তব উন্নয়ন চায়। আর রাজশাহী মহানগরীর তরুণ ভোটার শাকিল আহমেদ বলেন, দল নয়, উন্নয়নভিত্তিক রাজনীতিই তরুণদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্যেও রয়েছে দ্বিধা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ড. জাহাঙ্গীর করিম মনে করেন, ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি শক্তিশালী হলেও মনোনয়ন ঘিরে অসন্তোষ তাদের ঐক্য দুর্বল করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেনের মতে, জামায়াত দীর্ঘদিন পর তাদের তৃণমূল সংগঠনকে শক্তভাবে মাঠে নামিয়েছে, যা কয়েকটি আসনে ফল পাল্টে দিতে পারে।

সব মিলিয়ে রাজশাহীর ছয়টি আসনেই এবার নির্বাচনি লড়াই জমজমাট। বিএনপি ও জামায়াতের শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থী, ভোটার উপস্থিতি এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক— সবকিছু মিলিয়ে রাজশাহী এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ভোটযুদ্ধের অপেক্ষায়। শেষ পর্যন্ত জনগণের রায়ই নির্ধারণ করবে, এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে কার হাসি সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত