প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচটি কাগজে–কলমে একপেশে মনে হলেও মাঠে শুরুটা মোটেও তেমন ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের পেস আক্রমণে শুরুতেই কেঁপে ওঠে ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ। একসময় মনে হচ্ছিল, বড় অঘটনের মুখে পড়তে পারে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট দলটি। তবে চাপের মুহূর্তে অভিজ্ঞতা, ধৈর্য এবং ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ঝলকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ভারত। সূর্যকুমার যাদবের অনবদ্য ব্যাটিং আর বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্সে ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ২৯ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করে জয়ের স্বস্তি নিয়ে।
এর আগে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে নেদারল্যান্ডস কিছুটা অঘটনের ইঙ্গিত দিলেও শেষ পর্যন্ত বড় দলগুলোই জয় দিয়ে শুরু করেছে। পাকিস্তান যেমন প্রথম ম্যাচে জয় তুলে নিয়েছে, তেমনি স্বাগতিক ভারতও নিজেদের প্রথম বাধা পেরিয়ে গেছে। তবে এই জয়ের পথ মোটেও সহজ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই ভারতকে চোখ রাঙিয়ে দেওয়ার মতো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, যা ম্যাচটিকে রোমাঞ্চকর করে তোলে।
ভারতের ইনিংসের শুরুটাই ছিল ধাক্কাময়। দলীয় মাত্র ৮ রানে ওপেনার অভিষেক শর্মার উইকেট হারিয়ে হোঁচট খায় তারা। আলী খানের বলে প্রথম আঘাতের পর থেকেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়তে থাকে। শ্যাডলি ভ্যান শালকউইকের পেস ঝড়ে যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে ভারতের টপ ও মিডল অর্ডার। একের পর এক ব্যাটার সাজঘরে ফিরতে থাকেন, স্কোরবোর্ডে বাড়তে থাকে চাপ। মাত্র ৭৭ রানের মধ্যেই ভারতের ৬ উইকেট তুলে নেয় যুক্তরাষ্ট্র, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে।
এই সময় ভারতের ইনিংস একপ্রকার ভেঙে পড়ার পথে। একশ রানের আগেই গুটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। মার্কিন শিবিরের উদ্দীপনা বাড়ছিল, দর্শকরাও অঘটনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ঠিক এমন মুহূর্তেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন সূর্যকুমার যাদব। শুরুতে ধীরস্থির ব্যাটিং করে পরিস্থিতি বুঝে নেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে আক্রমণের গিয়ার বদলে দেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের বোলারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সূর্যকুমার যাদব খেলেন এক অনবদ্য হার না মানা ইনিংস। ৮৪ রানের সেই লড়াকু ইনিংসে ছিল আত্মবিশ্বাস, নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসন এবং ম্যাচ সচেতন ব্যাটিংয়ের নিখুঁত মিশেল। অন্যপ্রান্তে কিছুটা সমর্থন দেন অধিনায়কও, যিনি করেন ৪৯ রান। তার ইনিংসে ছিল ১০টি বাউন্ডারি এবং ৪টি ছক্কা, যা ভারতের স্কোরবোর্ডকে সম্মানজনক জায়গায় পৌঁছে দেয়। শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেট হারিয়ে ভারত সংগ্রহ করে ১৬১ রান, যা শুরুতে অচিন্তনীয় মনে হচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বোলিংয়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন শ্যাডলি ভ্যান শালকউইক। একাই ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট শিকার করেন তিনি। তার গতিময় বোলিং ভারতীয় ব্যাটারদের অস্বস্তিতে ফেলেছিল এবং ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রকে দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল। আলী খানও শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তবে শেষদিকে রান আটকে রাখতে না পারায় ভারত লড়াই করার মতো পুঁজি পেয়ে যায়।
১৬২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে যুক্তরাষ্ট্রের শুরুটাও ভালো হয়নি। দলীয় ৮ রানে ওপেনার আন্দ্রিয়েস গুস ফিরে গেলে চাপ পড়ে যায় মার্কিন ব্যাটিং লাইনে। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়তে থাকে। ভারতের বোলাররা লাইন–লেংথে শৃঙ্খলা বজায় রেখে ব্যাটারদের রান তুলতে বাধা দেন। মাঝেমধ্যে কিছু আক্রমণাত্মক শট দেখা গেলেও বড় জুটি গড়তে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র।
দলীয় ৯৮ রানের মধ্যে ৬ উইকেট হারিয়ে কার্যত ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় মার্কিন শিবির। শেষদিকে কিছুটা লড়াইয়ের চেষ্টা হলেও প্রয়োজনীয় রান তোলার গতি আর ধরে রাখতে পারেনি তারা। নির্ধারিত ওভার শেষে ৮ উইকেট হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইনিংস থামে ১৩২ রানে। ফলে ২৯ রানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ভারত।
এই ম্যাচে ভারতের জয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল চাপ সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা। শুরুর ধাক্কার পর অনেক দলই ভেঙে পড়ে, কিন্তু ভারত অভিজ্ঞতা দিয়ে সেই ধাক্কা সামলে নিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করেছে, তারা কেবল অংশগ্রহণকারী নয়, বরং বড় দলগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাদের বোলিং আক্রমণ এবং শুরুতে দেখানো সাহসী ক্রিকেট ভবিষ্যতের জন্য আশার বার্তা দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচ ভারতকে সতর্ক করে দিয়েছে। টুর্নামেন্টের শুরুতেই এমন বিপদে পড়া দলটির জন্য এক ধরনের শিক্ষা হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারফরম্যান্সও বিশ্ব ক্রিকেটে সহযোগী দলগুলোর উন্নতির প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জয় না পেলেও তারা দেখিয়েছে, সঠিক দিনে যে কোনো দলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম।
সব মিলিয়ে, ভারত জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করলেও ম্যাচটি মনে করিয়ে দিয়েছে যে, এই ফরম্যাটে কোনো প্রতিপক্ষকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চোখ রাঙানি দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে তারা আরও বড় চমক দিতে প্রস্তুত।