প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দ্বিতীয় দফায় সর্বাত্মক অবরোধে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। রোববার সকাল থেকে বন্দরের জেটি, কনটেইনার টার্মিনাল, ডিপো এমনকি বহির্নোঙরেও কোনো শ্রমিক-কর্মচারী কাজে যোগ দেননি। এর ফলে বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে থমকে গেছে। পণ্য ওঠানামা বন্ধ থাকায় দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে তৈরি হয়েছে মারাত্মক স্থবিরতা, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জাতীয় অর্থনীতিতেও।
সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো পরিবহন প্রবেশ করেনি। পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান কিংবা কনটেইনার বহনকারী যানবাহনের দেখা মেলেনি বন্দরের প্রধান গেটগুলোতে। বন্দরের ভেতরে নীরবতা, জেটিগুলো ফাঁকা, ক্রেনগুলো স্থির। বহির্নোঙরে শতাধিক জাহাজ নোঙর করে অপেক্ষায় রয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগেই রয়েছে রমজানের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল। সময়মতো এসব পণ্য খালাস না হওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শ্রমিক-কর্মচারীদের এই অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচির মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত। শ্রমিকদের অভিযোগ, আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-কে এনসিটি ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করা হচ্ছে। তাদের দাবি, বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এই টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিলে দেশের সার্বভৌমত্ব, শ্রমিকদের অধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
এই দাবিকে কেন্দ্র করে ‘বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর নেতৃত্বে শ্রমিক-কর্মচারীরা আগে ছয় দিন কর্মবিরতি পালন করেন। পরে দুই দিনের বিরতির পর রোববার সকাল আটটা থেকে আবারও অবরোধ শুরু হয়। এই কর্মসূচিতে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং চট্টগ্রাম শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। আন্দোলনকারীরা বলছেন, চার দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই কাজে ফিরবেন না।
অবরোধের কারণে বন্দরের সব জেটি, টার্মিনাল, কনটেইনার ডিপো এবং বহির্নোঙরে কাজ বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বন্দরের বিভিন্ন গেটের সামনে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে আন্দোলনের ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের দাবি, এই আন্দোলনের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে ইতোমধ্যে চারজনকে আটক করা হয়েছে। তবে তাদের নাম-পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পাশাপাশি বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনে জড়িত ১৫ জন শ্রমিক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পাশাপাশি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
এর আগে শনিবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক এবং বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা মো. হুমায়ুন কবীর অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল না করা হলে শ্রমিকরা শেষ পর্যন্ত কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবেন। তার দাবি, এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, বরং এটি বন্দর ও দেশের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালনা করে। ফলে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। বিশেষ করে রমজানের আগে বন্দরের এই অচলাবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি ভোগান্তি ডেকে আনতে পারে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘ সময় বন্দর বন্ধ থাকলে পণ্য খালাসে বিলম্ব হবে, বাড়বে জাহাজের ডেমারেজ খরচ, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে ভোক্তার ওপর।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক বার্তা যাবে, অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্ষুণ্ন হতে পারে। তারা মনে করছেন, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এই সংকট সমাধান না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আগের কর্মবিরতির সময়েই বন্দরের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। জাহাজ জট, কনটেইনার জট এবং পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে শুধু বন্দরের নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন করে অবরোধ শুরু হওয়ায় সেই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী মহল এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দৃষ্টি এখন সরকারের দিকে। অনেকেই মনে করছেন, শ্রমিকদের দাবি ও বন্দর কর্তৃপক্ষের অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করতে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায়, চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকটে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর প্রভাব পড়বে দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও জনজীবনে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দর যেন অচল এক অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড। শ্রমিকদের আন্দোলন, কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মধ্য দিয়ে বন্দরের ভেতর-বাইরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই সংকট কোন পথে গড়ায়, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।