নির্বাচনি প্রচারে বাক্যবাণ ছুড়ুন, গুলি নয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৬ বার
নির্বাচনি প্রচারে বাক্যবাণ

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর মাত্র দুদিন দূরে। বলা যায়, নির্বাচন এখন সময়ের দরজায় দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নির্বাচনি প্রচার। শেষ মুহূর্তের এই প্রচারে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো মাঠে সর্বশক্তি নিয়ে নামলেও, তাদের বক্তব্য-বিবৃতির ভাষা এবং একে-অন্যের প্রতি দোষারোপ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে।

নির্বাচনি প্রচারের শুরু থেকেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুই জোটের শীর্ষ নেতারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে জনসভা ও সমাবেশ করেছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে বড় শহর—সব জায়গাতেই ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো। এখন সেই প্রচারের শেষ ধাপ এসে ঠেকেছে রাজধানী ঢাকায়। ঢাকাকে ঘিরে রাজনীতির গুরুত্ব বরাবরের মতোই বেশি, কারণ এখানকার বার্তা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এই দুই জোটের বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)সহ ছোট দলগুলোও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। জামায়াত জোটের শরিক হয়েও এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের নির্বাচনি প্রচার গণমাধ্যমে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব পাচ্ছে। সব মিলিয়ে নির্বাচনের মাঠে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক উপস্থিতি তৈরি হয়েছে।

গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় নির্বাচনি প্রচার। ওইদিন সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে সমাবেশের মধ্য দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার প্রচার শুরু করেন। একই দিনে ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বরে আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সমাবেশ করে ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান তার নির্বাচনি প্রচারণার সূচনা করেন। শুরু থেকেই দুই দলের প্রধানদের বক্তব্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রকাশ্যে একে-অন্যকে আক্রমণ না করার কথা বললেও বাস্তবে তার ব্যতিক্রম দেখা গেছে। প্রচারের প্রথম দিনেই তারেক রহমান তার বক্তব্যে সরাসরি নাম উল্লেখ না করে জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি দলটির বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, মানুষকে প্রতারণা এবং ধর্মীয় বিভ্রান্তির অভিযোগ তোলেন। পাশাপাশি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে এনে আবেগঘন রাজনৈতিক বার্তা দেন।

অন্যদিকে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে ‘ভোট ডাকাতি’ ও ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দ ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, গত ১৭ বছর মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং জনগণ নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চায় না। তার বক্তব্যে অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতা, দখল-বাণিজ্য ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়, যা স্পষ্টতই প্রতিপক্ষকে ঘিরে রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।

এরপর থেকে দুই জোটের প্রায় সব জনসভাতেই এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও তির্যক মন্তব্য অব্যাহত রয়েছে। কেউ কেউ এটিকে বাংলাদেশের রাজনীতির চিরচেনা রূপ হিসেবে দেখছেন। আবার অনেকে মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দোষারোপের রাজনীতি এবারও নতুন কোনো ব্যতিক্রম দেখাতে পারেনি।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, এই ধরনের বক্তব্যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে হেয় করা বা আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার একটি পুরোনো চর্চা। দলগুলো মনে করে, প্রতিপক্ষকে ছোট করতে পারলেই রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া যায়।

একই প্রতিবেদনে অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ বলেন, দোষারোপের রাজনীতি অনেকাংশেই রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। তার মতে, রাজনীতির খেলায় শত্রু-মিত্রের ধারণা সব সময়ই সক্রিয় থাকে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই প্রচারের সময় যেন কোনো ধরনের সহিংসতা না ঘটে। সহিংসতা হলে পুরো নির্বাচনী পরিবেশই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনি প্রচারে কথার আঘাত ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত বক্তব্যও সত্য হিসেবে গৃহীত হয়। এ কারণেই রাজনৈতিক নেতারা কথার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চান। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ মন্তব্য করেন, বিএনপি ও জামায়াতের এই বিপরীতমুখী বক্তব্য তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শগত অবস্থানেরই প্রতিফলন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বক্তব্যগুলোকে কেন্দ্র করে যদি বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হয়, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

আসলে গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্যই হলো ভিন্নমত। ভিন্নমত ছাড়া রাজনীতি একমাত্রিক হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক চিন্তাবিদ দরবেশ আলী খান বহু আগেই বলেছেন, রাজনীতি মূলত সমাজের সদস্যদের পার্থক্যের স্বাভাবিক প্রতিফলন। এই পার্থক্য থেকেই বিরোধের জন্ম, আর সেই বিরোধ থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে নির্বাচনি প্রচারে তির্যক বাক্যবাণ বা কঠোর শব্দচয়ন পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়। নির্বাচনি জনসভা কোনো একাডেমিক শ্রেণিকক্ষ নয়, যেখানে শুধুই পরিমিত ও মার্জিত ভাষা ব্যবহার হবে। আবেগ, তর্ক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকাশ এখানে স্বাভাবিক। তবে সেই ভাষা যেন ব্যক্তিগত চরিত্র হনন, বিদ্বেষ বা সহিংসতার উসকানিতে রূপ না নেয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতাদের। বাক্যবাণ ছোড়া যাবে, কিন্তু সেই বাক্য যেন কখনো গুলিতে রূপ না নেয়। কথার লড়াই গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু সহিংসতা গণতন্ত্রের শত্রু। নির্বাচনের এই শেষ সময়ে দেশের মানুষ চায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, নিরাপদ ভোটাধিকার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ।

নির্বাচনের ফল যাই হোক, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে রাজনীতি সহিংসতার পথে হাঁটে, শেষ পর্যন্ত তা জাতির জন্যই ক্ষতিকর হয়। তাই নির্বাচনি প্রচারের শেষ লগ্নে প্রার্থীদের প্রতি প্রত্যাশা একটাই, তির্যক কথায় সীমাবদ্ধ থাকুন, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সংঘাতের পথে যাবেন না। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য রক্ষা হোক বাক্যবাণে, গুলিতে নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত