প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ, মিডিয়া উদ্যোক্তা ও চীনের কঠোর সমালোচক জিমি লাইকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ ও রাষ্ট্রদ্রোহমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার প্রায় দুই মাস পর সোমবার এই সাজা ঘোষণা করা হয়। আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, এই রায়ের মধ্য দিয়ে হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের আরেকটি বড় নজির স্থাপিত হলো।
সোমবার আদালতের দেওয়া সংক্ষিপ্ত লিখিত রায়ে বলা হয়, জিমি লাইয়ের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং তার কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। আদালত মন্তব্য করে, ‘লাইয়ের গুরুতর অপরাধমূলক আচরণ বিবেচনায় নিয়ে আদালত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, এই মামলায় তার মোট সাজা ২০ বছরের কারাদণ্ড হওয়া উচিত।’ আদালতের এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয়, জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
বর্তমানে ৭৭ বছর বয়সী জিমি লাই ২০২০ সাল থেকেই কারাবন্দি রয়েছেন। একাধিক মামলায় তাকে আগেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং বিভিন্ন মেয়াদের সাজাও দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ এই মামলায় ২০ বছরের কারাদণ্ড ঘোষণার ফলে তার মুক্তির সম্ভাবনা কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। রায়ের পর আপিল করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তার আইনজীবী রবার্ট প্যাং সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, ‘কোন মন্তব্য নেই।’ এই নীরবতা নতুন করে জল্পনা তৈরি করেছে, আইনি লড়াই আদৌ কতদূর এগোবে।
জিমি লাই হংকংয়ের গণমাধ্যম জগতে একসময় অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ‘অ্যাপল ডেইলি’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা, যা দীর্ঘদিন ধরে চীনা সরকারের সমালোচনামূলক সম্পাদকীয় ও প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য পরিচিত ছিল। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার অবস্থানের কারণে তিনি বেইজিংয়ের চোখে শুরু থেকেই বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিলেন।
২০১৯ সালে হংকংজুড়ে যে ব্যাপক গণতন্ত্রপন্থি বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, জিমি লাই ছিলেন সেই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক ও সংগঠক। মাসের পর মাস ধরে চলা ওই বিক্ষোভে লাখো মানুষ অংশ নেয় এবং বেইজিং-সমর্থিত প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। সেই আন্দোলনের পরই চীন সরকার হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে। বেইজিং দাবি করে, এই আইন শহরের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ ঠেকানোর জন্য অপরিহার্য।
তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, পশ্চিমা দেশগুলো এবং স্থানীয় গণতন্ত্রপন্থিরা তীব্র সমালোচনা করে আসছে। তাদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যত ভিন্নমত দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই আইনের আওতায় ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’, ‘বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ’ কিংবা ‘সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র’-এর মতো বিস্তৃত ও অস্পষ্ট অভিযোগে বহু রাজনীতিক, অ্যাক্টিভিস্ট ও সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জিমি লাইয়ের গ্রেপ্তার ও বিচার সেই প্রেক্ষাপটেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ২০২০ সালের শেষ দিকে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর একের পর এক মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়, যার মধ্যে ছিল অবৈধ সমাবেশে অংশ নেওয়া, প্রতারণা এবং সর্বশেষ বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ। সমালোচকদের মতে, এই মামলাগুলো শুধু একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং পুরো গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনের প্রতি একটি কঠোর বার্তা।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, জিমি লাইয়ের সাজা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আরও এক ধাক্কা। তাদের মতে, এই রায় হংকংয়ে স্বাধীন গণমাধ্যম ও নাগরিক অধিকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই ধরনের কঠোর সাজা অন্য ভিন্নমতাবলম্বীদের জন্য একটি ভীতিকর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে চীনা কর্তৃপক্ষ এবং হংকং প্রশাসন বারবার বলছে, জাতীয় নিরাপত্তা আইন কোনোভাবেই সাধারণ নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন করার জন্য নয়। তাদের দাবি, আইনটি কেবলমাত্র অল্পসংখ্যক ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হচ্ছে, যারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। জিমি লাইয়ের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় হংকংয়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। একসময় ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ নীতির অধীনে তুলনামূলক স্বাধীন পরিবেশে থাকা শহরটি এখন ক্রমেই বেইজিংয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে যাচ্ছে। গণতন্ত্রপন্থি রাজনীতি, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক আন্দোলনের পরিসর দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
জিমি লাইয়ের ব্যক্তিগত জীবনও এই মামলার কারণে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। বয়স, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং দীর্ঘ কারাবাস—সব মিলিয়ে তার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে। পরিবারের সদস্যরা এবং সমর্থকেরা বলছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে এভাবে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া অমানবিক।
সব মিলিয়ে, জিমি লাইয়ের ২০ বছরের কারাদণ্ড শুধু একজন মিডিয়া মোগলের শাস্তি নয়, বরং হংকংয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে চলমান বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই রায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও হংকং ও চীনের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এই আইনের প্রয়োগ আরও কীভাবে হয় এবং এর প্রভাব কতদূর বিস্তৃত হয়, সেটিই এখন বিশ্ববাসীর নজরে।