ফেব্রুয়ারির শুরুতেই ৭৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্সে আশার বার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৩ বার
ফেব্রুয়ারির শুরুতেই ৭৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্সে আশার বার্তা

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেই দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাসের প্রথম সাত দিনেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ৭৯ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। গড় হিসাবে প্রতিদিন দেশে এসেছে প্রায় ১১ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, যা সাম্প্রতিক সময়ের প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গত বছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় ছিল ৬৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এই প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রবাসে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি শুধু নিজেদের পরিবার নয়, বরং পুরো দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রেখে চলেছেন। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এই ধারাবাহিক প্রবাহ সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বৈদেশিক দেনা পরিশোধে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করে। ফেব্রুয়ারির শুরুতেই বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স আসা প্রমাণ করে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই মাস থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ২২ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় ২১ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, প্রবাসী আয় ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়া, ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধার সম্প্রসারণ এবং সরকারের প্রণোদনা নীতির ফলেই এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।

এর আগের মাসগুলোর চিত্রও একইভাবে আশাব্যঞ্জক। জানুয়ারি মাসে দেশে এসেছে ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা দেশের ইতিহাসে কোনো এক মাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় হিসেবে বিবেচিত। একই সঙ্গে এটি চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক রেমিট্যান্স। এরও আগে ডিসেম্বর মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ মার্কিন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং চলতি অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক রেমিট্যান্সের রেকর্ড গড়েছে।

এই ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা পাঠালে সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের ডিজিটাল সেবা সহজীকরণ, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের প্রসার এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি—সব মিলিয়ে প্রবাসীরা এখন আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন আনুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠাতে। এতে একদিকে যেমন প্রবাসীদের অর্থ নিরাপদ থাকছে, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ। এটি দেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড। এই অর্জন শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বগতি তা অনেকটাই লাঘব করতে সহায়তা করছে। আমদানি ব্যয় মেটানো, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক দেনা পরিশোধে এই আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিতেও রেমিট্যান্সের সরাসরি প্রভাব পড়ছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দিয়ে পরিবারগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ব্যয় করছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, চলতি অর্থবছরের বাকি সময়েও রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা নিয়মিতভাবে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে এই আয় আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই ৭৯ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের একটি শক্ত প্রমাণ। দেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময়ে এই আয় নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। সঠিক নীতি, প্রবাসীবান্ধব উদ্যোগ এবং বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা ধরে রাখতে পারলে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আরও বড় শক্তিতে পরিণত হবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত