প্রকাশ: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকায় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নে সরকার নতুন এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়েছে। ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ-২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজ—ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ এবং সরকারি তিতুমীর কলেজ—উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একাডেমিকভাবে যুক্ত হবে, তবে প্রতিটি কলেজের স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে।
এর আগের ইতিহাসে, এই সাত কলেজ ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। কিন্তু কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা অভিযোগ তুলেছিলেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষাগত অধিকার ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় ব্যর্থ। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলন এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার প্রতিক্রিয়ায় ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই কলেজগুলোর অধিভুক্তি বাতিল করে। এর ফলে কলেজগুলোতে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হলেও, প্রশাসনিক এবং শিক্ষাগত কাঠামো নিয়ে দীর্ঘ সময় বিতর্ক চলতে থাকে।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের উদ্যোগের পেছনে রয়েছে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলন এবং শিক্ষাগত স্বাতন্ত্র্য রক্ষার দাবী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ‘ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান’-এর পর এই দাবি আরও শক্তিশালী হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে মিলিত হয়ে চার সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে, যা সাত কলেজের জন্য সমকক্ষ স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর রূপরেখা প্রণয়ন করে।
খসড়া অধ্যাদেশে প্রস্তাব করা হয়েছিল যে কলেজগুলোকে চারটি স্কুলে বিভক্ত করা হবে এবং ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি’ কাঠামোর মধ্যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করা হবে। এই প্রস্তাবে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাদান চালুর কথাও বলা হয়েছিল। তবে কলেজগুলোর শিক্ষক ও কর্মী দলে আশঙ্কা জন্মায় যে, এ ধরনের কাঠামো তাদের পদোন্নতি এবং মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে। তারা দাবি জানান, কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে ‘অধিভুক্তিমূলক’ কাঠামোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করা হোক।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই যৌথ দাবি এবং আন্দোলনের কারণে সরকার খসড়া অধ্যাদেশের কাঠামো পরিবর্তন করে। চূড়ান্ত অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কলেজগুলোর একাডেমিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার শর্তে তারা ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এতে কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে না, এবং কলেজের নিজস্ব শিক্ষাগত পরিচয়ও রক্ষা পাবে।
উল্লেখযোগ্য যে, গঠিত বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, গবেষণা কার্যক্রমেও কলেজগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়েই একটি স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় পাবেন, যা শিক্ষাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। একইসঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের প্রক্রিয়া শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনিক অংশীদারদের মতামতকে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ায় এটি গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগ হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ইউজিসি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা প্রস্তাব করেছে। কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের একাংশও এই পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং দ্রুততম সময়ে অধ্যাদেশ জারি করে আইনি কাঠামো নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে। অবশেষে ২২ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন করে এবং দুই সপ্তাহ পর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির এই কাঠামো উচ্চশিক্ষায় এক নতুন অধ্যায় শুরু করবে। কলেজগুলোর স্বাধীনতা বজায় রাখার মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক ও গবেষণামূলক কাজের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে পারবে। একই সঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজধানীর শিক্ষাক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত সুযোগ সৃষ্টির আশা জাগাচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠা শিক্ষাক্ষেত্রে সমন্বয়, স্বাতন্ত্র্য ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থার প্রতিফলন। এটি শিক্ষার্থীদের অধিকার, শিক্ষক ও কর্মীদের স্বীকৃতি এবং দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। সরকারি উদ্যোগ, শিক্ষার্থীর আন্দোলন এবং শিক্ষাগত পরামর্শের সমন্বয়ে গঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।