প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তরুণদের প্রত্যাশার একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জনগণকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক এবং ১১ দলীয় জোট প্রার্থীদের নির্বাচিত করার আহ্বান জানান। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে একযোগে প্রচারিত এই ভাষণে তিনি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্র সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেন।
প্রায় ১৮ মিনিটের ভাষণে জামায়াত আমির বলেন, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায় এবং সেই পরিবর্তনের জন্যই জনগণের সামনে এই আহ্বান। তিনি বলেন, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচন নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও কাঠামোগত পুনর্গঠনের সুযোগ। তিনি দাবি করেন, জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহারে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পাঁচটি বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ এবং পাঁচটি বিষয়ে ‘না’ বলতে হবে। সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান ছাড়া একটি উন্নত ও নৈতিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানান।
ভাষণের শুরুতেই তিনি জুলাই শহীদদের মাগফিরাত কামনা করেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। তিনি বলেন, জুলাই হয়েছিল কারণ জনগণ রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছিল। সেই সময় দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকাকেও তিনি প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা আর কোনো জুলাই দেখতে চান না। তাদের লক্ষ্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়া, যেখানে জনগণকে আর কখনো অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় নামতে হবে না। তার ভাষায়, জুলাই ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ এবং দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা পরিবারতন্ত্র ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
তিনি অভিযোগ করেন, ২০০৯ সালের পর থেকে দেশে এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা মানবাধিকার ও ভোটাধিকারকে পদদলিত করেছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং তথাকথিত আয়নাঘরের মাধ্যমে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনকে তিনি ‘নির্বাচনের নামে তামাশা’ আখ্যা দেন এবং বলেন, এসব নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
জামায়াত আমির বলেন, রক্তাক্ত জুলাইয়ের পেছনে এসব নিপীড়নই প্রধান কারণ। তিনি বলেন, আজকের তরুণরা একটি নতুন দেশ দেখতে চায়, যে দেশকে তারা গর্ব করে বলতে পারবে ‘নতুন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ২.০’। তার মতে, এই নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে বর্তমান প্রজন্মের সাহসী ও সচেতন তরুণরা।
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই দেশ তাদের হাতেই তুলে দিতে হবে। কারণ তারাই পরিশ্রমী, সাহসী ও মেধাবী। তারা প্রযুক্তি বোঝে, নতুন চিন্তাকে গ্রহণ করে এবং পরিবর্তনের সাহস রাখে। তিনি বলেন, জামায়াত তরুণদের হাত ধরতে চায় এবং জুলাইয়ের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার অংশীদার হতে চায়।
তিনি বলেন, তাদের লক্ষ্য বিভেদ ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে দেশকে মুক্ত করা। এমন একটি বাংলাদেশ গড়া, যেখানে রাষ্ট্র হবে সবার এবং সরকার হবে জনগণের। পারিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কেউ রাষ্ট্রক্ষমতায় বসতে পারবে না—এমন ব্যবস্থাই তারা প্রতিষ্ঠা করতে চান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ চায় নিরাপত্তা, সুশাসন ও ইনসাফ। তিনি জানান, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সরকার কিছু সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। সেই সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নারী অধিকার প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, যে সমাজ নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, তাদের সরকারে নারীরা সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে গৌরবের সঙ্গে অংশ নেবেন এবং কোনো নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন না।
তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হলে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে মর্যাদা দিতে হবে। বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সবার দেশ—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ যেন ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস না করে।
শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে তিনি নতুন বাংলাদেশের তিনটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, শিক্ষা হতে হবে নৈতিকতাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর। বিচারব্যবস্থায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া দুর্নীতি ও দুঃশাসন বন্ধ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে দেশকে বের করে আনতে ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে সমমর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের বিষয়েও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
প্রবাসীদের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, তাদের অধিকার ও মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা হবে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের সমস্যার সমাধানে বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
ভাষণের শেষদিকে নির্বাচনি প্রচারে সহযোগিতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান এবং কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কোনো ভোগের বিষয় নয়, এটি একটি আমানত। এই আমানত রক্ষার দায়িত্ব জনগণের সমর্থন নিয়েই পালন করতে চান তারা।
ভাষণের সমাপ্তিতে তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তারা তরুণদের সমাজের ককপিটে বসাতে চান। বাংলাদেশ নামের উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন হবে তরুণরাই, আর বর্তমান নেতৃত্ব থাকবে যাত্রী আসনে। তার ভাষায়, এই দেশ তরুণদের জন্য, এই দেশ তরুণদের হাতেই তুলে দিতে চান তারা।