প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে নিলামের মাধ্যমে আরও ২০৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলমান ডলার সংকট ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগকে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, সর্বশেষ নিলামে দেশের ১৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে মোট ২০ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার কেনা হয়েছে। এ নিলামে ডলারের কাটঅফ মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ বাজারে প্রচলিত দর বিবেচনায় রেখেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ডলার সংগ্রহ করেছে, যাতে একদিকে রিজার্ভ শক্তিশালী হয় এবং অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা কমে।
চলতি ফেব্রুয়ারি মাসেই এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের চতুর্থ দফা ডলার ক্রয়। এই চার দফায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ৭৯ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে বলে জানানো হয়েছে। এর আগে জানুয়ারি মাসসহ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিভিন্ন সময়ে নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ৪৭২ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ডলার কেনার পেছনে মূল লক্ষ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা আনা এবং বাজারে ডলারের চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে ডলারের ওপর চাপ বেড়েছে। এর ফলে টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যায় এবং বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য একটি কার্যকর নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, নিলাম পদ্ধতিতে ডলার কেনার ফলে বাজারে স্বচ্ছতা বজায় থাকে। কোন ব্যাংক কত দরে ডলার বিক্রি করতে আগ্রহী, তা স্পষ্টভাবে উঠে আসে এবং বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে কৃত্রিমভাবে দর বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ কমে যায়। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতেও একটি শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার ক্রয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। এটি একদিকে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। তারা মনে করছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রপ্তানি আয়ের একটি অংশ যখন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আসছে, তখন সেই ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে যুক্ত করা ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
তবে কেউ কেউ সতর্ক করে বলছেন, ডলার কেনার পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও জোরদার করা জরুরি। শুধু বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করলেই দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে না। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ কমানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা বা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা আনার দিকেই তাদের নীতি। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্বাভাবিক ওঠানামা ঠেকানো এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করা। সেই লক্ষ্যেই নিলাম পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।”
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্যও কিছুটা স্বস্তি এসেছে। ডলার বাজারে অনিশ্চয়তা কমলে আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত লেনদেন পরিকল্পনা করা সহজ হয়। বিশেষ করে শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের দর স্থিতিশীল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ মানুষের জীবনের ওপরও ডলারের দরের প্রভাব পড়ে। ডলারের দাম বাড়লে আমদানি করা পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ধরনের উদ্যোগকে অনেকেই পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখছেন।
চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে ডলার বাজারের গতিপ্রকৃতি কী হবে, তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, প্রয়োজনে তারা ভবিষ্যতেও নিলামের মাধ্যমে বাজারে হস্তক্ষেপ করতে প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে, আরও ২০৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কেনার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও স্পষ্ট করল যে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখা তাদের অগ্রাধিকার। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের তথ্য এই ইঙ্গিতই দেয় যে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সামনে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত সমন্বয়ের ওপর।