প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বর্ণবাজারে আবারও ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। টানা সমন্বয়ের ধারাবাহিকতায় এবার ভরিতে দুই হাজার ২১৬ টাকা বাড়িয়ে সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট সোনার ভরি দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকায়, যা সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবার মধ্যেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকেই সোনার দামে যে অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক এই মূল্যবৃদ্ধি সেই প্রবণতাকেই আরও স্পষ্ট করল।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সোমবার সকালে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সোনার এই নতুন দর ঘোষণা করে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সোমবার সকাল থেকেই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে এবং আজ মঙ্গলবারও একই দামে দেশের বাজারে সোনা বিক্রি হচ্ছে। বাজুসের তথ্যমতে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার বা পিওর গোল্ডের মূল্য বাড়ায় এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবের পাশাপাশি দেশীয় কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিও এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সোনার দাম বাড়ার এই খবরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জুয়েলারি মার্কেটে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে স্বাভাবিক বাজারপ্রবণতা হিসেবে দেখছেন, আবার অনেক ক্রেতা এ দামে গয়না কেনা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুম ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের কারণে যাঁরা সোনা কেনার পরিকল্পনা করছিলেন, তাঁদের জন্য নতুন এই দাম কিছুটা চাপ তৈরি করেছে।
বাজুস ঘোষিত নতুন দর অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট সোনার পাশাপাশি অন্যান্য ক্যারেটের সোনার দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২১ ক্যারেট, ১৮ ক্যারেট এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার দামও নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও সোনার এই মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় রুপার বাজার আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে। রুপার দামে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। ফলে যাঁরা রুপার গয়না বা অলংকার কেনার কথা ভাবছেন, তাঁদের জন্য বাজার এখনো আগের অবস্থানেই রয়েছে।
বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ঘোষিত দামের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত পাঁচ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ছয় শতাংশ ন্যূনতম মজুরি যোগ করতে হবে। তবে গয়নার ডিজাইন, মান ও কারুকাজের ওপর ভিত্তি করে মজুরি ভিন্ন হতে পারে। অর্থাৎ ক্রেতাকে চূড়ান্তভাবে যে দাম পরিশোধ করতে হবে, তা কেবল ভরির মূল দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হওয়ায় বাস্তবে সোনা কেনার খরচ আরও কিছুটা বেড়ে যায়, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য একটি বড় বিবেচনার বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়ার পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি এবং স্থানীয় চাহিদা—সবকিছু মিলিয়ে দেশের বাজারে সোনার দামে প্রভাব পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন সোনার দাম বাড়ে, তখন আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের বাজারেও তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি ডলার সংকট বা আমদানি ব্যয় বাড়লে স্থানীয় বাজারে দাম সমন্বয় করা ছাড়া বিকল্প থাকে না।
এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সোনার দাম বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে এর চাহিদা পুরোপুরি কমে যায় না। কারণ আমাদের সমাজে সোনা শুধু অলংকার নয়, এটি একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবেও বিবেচিত। বিশেষ করে অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেকেই সোনাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখেন। ফলে দাম বাড়লেও এক শ্রেণির ক্রেতা ও বিনিয়োগকারী বাজারে সক্রিয় থাকেন।
অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, সোনার এই লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে এক ভরি সোনার দাম তুলনামূলকভাবে নাগালের মধ্যে ছিল, সেখানে এখন তা দুই লাখ টাকার অনেক ওপরে। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে গয়নার ওজন কমাচ্ছেন কিংবা সোনা কেনার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার রুপা বা বিকল্প ধাতুর গয়নার দিকে ঝুঁকছেন।
রুপার বাজারে স্থিতিশীলতা থাকলেও সোনার দামের এই ঊর্ধ্বগতি ভবিষ্যতে রুপার চাহিদা বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সোনার তুলনায় রুপা এখনো তুলনামূলক সস্তা এবং দৈনন্দিন অলংকার হিসেবে এটি ব্যবহারযোগ্য। যদিও সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সোনার অবস্থান আলাদা, তবুও দামের ব্যবধান বাড়লে ক্রেতার আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে।
সব মিলিয়ে আজকের বাজারে সোনার দাম বৃদ্ধির খবর দেশের অর্থনীতি, ভোক্তা আচরণ এবং গয়না শিল্প—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে। বাজুসের ঘোষিত নতুন দর অনুযায়ী আপাতত বাজার চললেও আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজার ও স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আবারও দাম সমন্বয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে সোনা কেনা বা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজার পরিস্থিতি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।