প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে এক ভিন্নচিত্র দেখা যাচ্ছে। ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে একসঙ্গে চার দিনের ছুটি পাওয়ায় হাজার হাজার পোশাককর্মী রাজধানীসংলগ্ন এই শিল্পনগরী ছেড়ে নিজ নিজ গ্রামের পথে রওনা হয়েছেন। কর্মজীবনের ব্যস্ততা ও দৈনন্দিন সংগ্রামের মধ্যেও ভোট দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা যে শ্রমজীবী মানুষের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, গাজীপুরের মহাসড়কগুলোতে সৃষ্টি হওয়া ভিড় ও চাপ তারই বাস্তব প্রমাণ দিচ্ছে।
সোমবার রাত থেকেই গাজীপুরের চন্দ্রা-সফিপুর ও বাড়ইপাড়া এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রায় ১০ কিলোমিটারজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। রাতভর মানুষ ও যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায় সড়কের দুই পাশে। যদিও মঙ্গলবার সকাল থেকে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তবুও এখনো বিপুলসংখ্যক পোশাকশ্রমিক ভোট দিতে বাড়ি ফেরার জন্য মহাসড়কে অপেক্ষা করছেন।
গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় সব পোশাক কারখানাতেই ভোট উপলক্ষে একসঙ্গে চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকেন। ভোটের এই ছুটি তাদের কাছে শুধু নাগরিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ নয়, বরং আপনজনের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি আবেগঘন উপলক্ষ। তাই সুযোগ পেয়ে তারা দলে দলে গ্রামের পথে রওনা হচ্ছেন।
শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যার পর থেকেই তারা বাসস্ট্যান্ড ও মহাসড়কে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত যানবাহন পাওয়া যাচ্ছিল না। কেউ কেউ রাতভর অপেক্ষা করেছেন, কেউ আবার খোলা আকাশের নিচে বসেই কাটিয়েছেন সময়। মঙ্গলবার সকালে যানবাহন চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হলেও নতুন করে শুরু হয় আরেক ভোগান্তি—অতিরিক্ত ভাড়া। অনেক পরিবহনশ্রমিক ও চালক যাত্রীদের কাছ থেকে স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা দাবি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
একজন পোশাককর্মী বলেন, ‘আমরা কষ্ট করে মাস শেষে বেতন পাই। ভোট দিতে বাড়ি যাচ্ছি, এটাও আমাদের অধিকার। কিন্তু বাসে উঠতে গেলে দ্বিগুণ ভাড়া চাইছে। না দিলে উঠতে দিচ্ছে না।’ আরেক শ্রমিক জানান, পরিবারে বৃদ্ধ বাবা-মা ও সন্তানদের জন্য তিনি অনেক দিন পর বাড়ি যাচ্ছেন। কিন্তু অতিরিক্ত ভাড়া দিতে গিয়ে তার পুরো বাজেট এলোমেলো হয়ে গেছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের বড় একটি অংশই দেশের উত্তরবঙ্গ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার ভোটার। তাদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ায় ভোট দিতে নিজ এলাকায় যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। এই বাস্তবতায় নির্বাচন সামনে এলেই গাজীপুর থেকে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের ঘরমুখী স্রোত দেখা যায়। তবে এবার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছুটির সংখ্যা বেশি হওয়ায় এই চাপ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
মহাসড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, গাজীপুরের চন্দ্রা পয়েন্ট দিয়ে উত্তরবঙ্গগামী শ্রমিকদের চাপ সবচেয়ে বেশি। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের এই অংশটি শিল্পাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হওয়ায় এখানে একসঙ্গে অনেক মানুষ ও যানবাহন জড়ো হচ্ছে। পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরলসভাবে কাজ করছে। যানজট নিরসনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং যানবাহনগুলোকে ধাপে ধাপে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
একজন ট্রাফিক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি যাতে শ্রমিকরা নিরাপদে এবং যতটা সম্ভব কম ভোগান্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। তবে একসঙ্গে এত মানুষের যাত্রার কারণে কিছুটা চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটি সামাল দিতে সময় লাগছে।’
এই ঘরমুখী যাত্রার ভিড়ে মানবিক চিত্রও চোখে পড়ছে। অনেক শ্রমিকের হাতে ছোট ছোট ব্যাগ, কারও সঙ্গে শিশু, কারও চোখে দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফেরার আনন্দ। আবার কারও চোখে ক্লান্তি ও উৎকণ্ঠা—কখন গাড়ি মিলবে, কখন বাড়ি পৌঁছানো যাবে। ভোট দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর পরিবারের টানে তারা সব কষ্ট সহ্য করেই এগিয়ে চলেছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শ্রমজীবী মানুষের এই অংশগ্রহণ নির্বাচনের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যেও তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য সময় বের করছেন, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের আস্থার প্রতিফলন। তবে একই সঙ্গে তারা বলছেন, এই যাত্রাকে আরও স্বস্তিদায়ক করতে পরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এদিকে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানো ও ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। গাজীপুরের মহাসড়কে পোশাককর্মীদের এই ঘরমুখী স্রোত সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও একই সঙ্গে এটি গণতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও প্রত্যাশারও শক্ত প্রমাণ।
ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই গাজীপুর ছাড়ছে শ্রমিকদের বহর। যানজট, ভোগান্তি আর অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ সত্ত্বেও তাদের কণ্ঠে একটাই কথা—ভোট দেব, নিজের অধিকার নিজেই প্রয়োগ করব। এই দৃশ্য শুধু একটি নির্বাচনের গল্প নয়, এটি শ্রমজীবী মানুষের নাগরিক সচেতনতারও এক জীবন্ত দলিল।