কৃষিঋণে গতি বাড়ছে, টেকসই নজরদারি এখন বড় চ্যালেঞ্জ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৮ বার
কৃষিঋণে গতি বাড়ছে, টেকসই নজরদারি এখন বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের কৃষিঋণ খাতে যে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তা গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে কৃষিঋণ বিতরণ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮ কোটি টাকায়। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই অগ্রগতি দেশের কৃষি অর্থায়নে একটি ইতিবাচক মোড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে ঋণ আদায়ের হারও বেড়েছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কৃষিঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনাকে জোরালো করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কৃষিঋণ আদায় হয়েছে ২১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। তবে ঋণ আদায় বাড়লেও মোট বকেয়া কৃষিঋণের পরিমাণ এক বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৭২৩ কোটি টাকায়, যা প্রায় ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। ঋণ বিতরণ ও আদায়—দুই সূচকেই একযোগে বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনীতিবিদরা এটিকে সামগ্রিকভাবে কৃষি অর্থায়নের স্থিতিশীলতার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন, যদিও বকেয়ার ক্রমবর্ধমান চাপ ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তাও বহন করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিঋণ বিতরণ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক বাস্তব কারণ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সার, বীজ, কীটনাশক ও জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষকদের সেচ, ফসলের জাত পরিবর্তন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। এসব কারণে কৃষকের আর্থিক চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে, যার প্রতিফলন কৃষিঋণ বিতরণে দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত উদ্যোগ, যেখানে কৃষি ও পল্লি ঋণকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি—উভয় শ্রেণির ব্যাংককে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো, কৃষিঋণের আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ঋণপ্রবাহ জোরদার করার চেষ্টা চলছে।

তবে কৃষিঋণ বিতরণে এই গতি যতটা আশাব্যঞ্জক, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর সঠিক ব্যবহার ও তদারকি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না; এই অর্থ যেন উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে অনেক সময় কৃষিঋণের অর্থ কৃষি বহির্ভূত খাতে চলে যায়, যা শেষ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে।

এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, কৃষিঋণ বিতরণ ও আদায়—উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সংকেত। তাঁর মতে, সময়মতো ও কার্যকর ঋণপ্রবাহ কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে এবং তাদের আয় ও জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উন্নত বীজ, আধুনিক সেচব্যবস্থা ও যান্ত্রিক কৃষি উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ বাড়লে ফসল উৎপাদন বাড়ে, যা সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী করে।

ড. রিয়াজ আরও বলেন, ঋণ আদায়ের হার বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে যে কৃষকরা ঋণ ব্যবস্থাপনায় আগের চেয়ে বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করছেন। এটি ব্যাংক ও কৃষক—উভয়ের জন্যই একটি টেকসই ঋণচক্র তৈরিতে সহায়ক। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কৃষি অর্থায়নের ক্ষেত্রে এখনো সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের অন্তর্ভুক্তি। দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্ষুদ্র কৃষক এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছেন এবং বাধ্য হয়ে উচ্চ সুদের অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতার ওপর নির্ভর করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে কৃষি খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অনানুষ্ঠানিক ঋণের উচ্চ সুদের বোঝা কৃষকদের আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতায় বাধা সৃষ্টি করে। তাই কৃষিঋণের বর্তমান ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে রূপ দিতে হলে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি। এর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মাঠপর্যায়ের তদারকি, কৃষকদের জন্য আর্থিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে যদি কৃষিঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তবে এটি শুধু কৃষকদের নয়, পুরো অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে। কৃষি খাত শক্তিশালী হলে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়বে, দারিদ্র্য হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও গতিশীল হবে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নজরদারি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

সার্বিকভাবে বলা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে কৃষিঋণ বিতরণ ও আদায়ের প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা। কিন্তু এই অগ্রগতিকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দিতে হলে ঋণের সঠিক ব্যবহার, খেলাপি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রান্তিক কৃষকদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই কৃষিঋণ সত্যিকার অর্থে গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত