লিবিয়ার উপকূলে অভিবাসীবাহী নৌকাডুবি: প্রাণ গেল ৫৩ জনের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৭১ বার
লিবিয়ায় অভিবাসীবাহী নৌকাডুবিতে প্রাণহানি

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

লিবিয়ার উপকূলে আবারও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অভিবাসীদের বহনকারী একটি রাবারের নৌকা উল্টে অন্তত ৫৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। এই মর্মান্তিক ঘটনায় জীবিত উদ্ধার হয়েছেন মাত্র দুই নারী, যাদের দুজনই নাইজেরিয়ার নাগরিক।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, নৌকাটিতে মোট ৫৫ জন যাত্রী ছিলেন। শুক্রবার উত্তর-পশ্চিম লিবিয়ার উপকূলীয় শহর আল-জাওইয়া থেকে যাত্রা শুরু করে নৌকাটি। যাত্রার প্রায় ছয় ঘণ্টা পর গভীর সমুদ্রে থাকা অবস্থায় নৌকার ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নৌকাটি উল্টে যায় এবং একে একে যাত্রীরা সাগরের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে থাকেন।

আইওএম জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় নৌকাটিতে থাকা অধিকাংশ যাত্রী ছিলেন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভিবাসী ও শরণার্থী। তারা দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা থেকে মুক্তি পেতে ইউরোপে পাড়ি জমানোর ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথই শেষ পর্যন্ত তাদের জীবনের পরিণতি ডেকে আনে।

বেঁচে যাওয়া দুই নারীর একজন আইওএম কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, এই দুর্ঘটনায় তিনি তার স্বামীকে হারিয়েছেন। অন্য নারী জানিয়েছেন, তার দুই শিশুই নৌকাডুবির সময় মারা গেছে। সন্তান হারানোর শোক আর স্বামীর মৃত্যুর খবর—দুই নারীর মানসিক অবস্থা অত্যন্ত ভেঙে পড়ার মতো বলে জানিয়েছে উদ্ধারকারী দল। তাদের দুজনকেই উদ্ধার করার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

আইওএমের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১১টার দিকে ত্রিপোলির পশ্চিমে অবস্থিত আল-জাওইয়া উপকূল থেকে নৌকাটি ছেড়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর শুক্রবার ভোরের দিকে জুওয়ারার উত্তরে এটি উল্টে যায়। তবে দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ পেতে কিছুটা দেরি হয়। কেন এত দেরিতে তথ্য সামনে এলো, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এই নৌকাডুবির ঘটনা আবারও লিবিয়া-ভিত্তিক অভিবাসন রুটের ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। ২০১১ সালে লিবিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা চরম আকার ধারণ করে। সেই সুযোগে মানবপাচারকারী চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সাব-সাহারান আফ্রিকা থেকে ইউরোপগামী অভিবাসীদের জন্য লিবিয়া একটি প্রধান প্রস্থানকেন্দ্রে পরিণত হয়।

আইওএমের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায় ৫০০ অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক নৌকাডুবির ঘটনা কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয় না।

সংস্থাটি আরও জানায়, শুধু গত জানুয়ারি মাসেই মধ্য ভূমধ্যসাগরে বৈরী শীতকালীন আবহাওয়ার মধ্যে একাধিক নৌকাডুবির ঘটনায় অন্তত ৩৭৫ অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। প্রচণ্ড ঠান্ডা, উত্তাল সমুদ্র এবং অনিরাপদ নৌযান এসব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে, অভিবাসন সংকটকে কেবল নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখলে এই ধরনের প্রাণহানি বন্ধ করা সম্ভব নয়। বরং অভিবাসীদের নিরাপদ ও বৈধ পথে চলাচলের সুযোগ তৈরি করা এবং মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

আইওএমের একজন মুখপাত্র বলেন, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার পথে প্রাণহানির সংখ্যা কমাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে লিবিয়ায় আটক অভিবাসীদের মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং তাদের জন্য নিরাপদ বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলাও অত্যন্ত জরুরি।

লিবিয়ার উপকূলে এই নৌকাডুবির ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি অভিবাসন সংকটের গভীর মানবিক ট্র্যাজেডির প্রতিচ্ছবি। ইউরোপে একটি নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছাড়লেও, সেই স্বপ্ন যে কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে—এই ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত