প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শেষমেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সই হয়েছে। অনেকের মুখে হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস, কারণ বাংলাদেশের কিছু শুল্ক কমানো হয়েছে। তবে এই চুক্তি করার জন্য যে সমস্ত অঙ্গীকার আমাদের মেনে নিতে হয়েছে, তা কী ধরনের চাপের সৃষ্টি করবে, তা নিয়ে চিন্তিত অর্থনীতিবিদরা। সেই সঙ্গে চুক্তির সব শর্তাবলী এখনো পরিপূর্ণভাবে জানা যায়নি, যা ভবিষ্যতের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ।
দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অশুল্ক বাধা কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিশ্ব বাণিজ্যে নিজেদের অংশ বৃদ্ধি করতে হলে দেশগুলোকে একই ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তবে উদ্বেগের বিষয়, এই সুবিধা যেন শুধু একটি দেশের জন্য প্রযোজ্য না হয়। বাংলাদেশের মতো দেশের পক্ষে এটি সমানভাবে প্রযোজ্য হয় কিনা, তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
এই চুক্তিগুলো দ্বিপক্ষীয়। এর অর্থ, এতদিন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধীনে যে নিয়মতান্ত্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ছিল, তা থেকে আমরা সরে আসছি। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, এবং এতে আমাদের অনেক কিছু মেনে নিতে হয়েছে। মূল উদ্বেগ হলো, অন্যান্য দেশও যদি একই ধরনের দ্বিপক্ষীয় চাপে বাংলাদেশকে বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে বাধ্য করে, তখন আমরা কি প্রস্তুত থাকব? এটি পরবর্তী সময়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করতে পারে।
বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্য প্রেক্ষাপটে প্রতিটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ভারতের মতো বড় দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান ভারসাম্যহীন। তাদের কাছে অনেক বিকল্প রয়েছে—যেমন তারা ভেনেজুয়েলার তেল কিনতে পারে বা মার্কিন বাজারে সুবিধা পেতে পারে। আমাদের ক্ষমতা সীমিত, তাই এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে আমাদের জন্য চাপ অনেক বেশি।
এদিকে, লেস ডেভেলপড কান্ট্রি (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্যে এলডিসি হিসেবে দেশের হিস্যা গত ২০-৩০ বছরে উল্লেখযোগ্য হ্রাস পেয়েছে। এক শতাংশের মতো। বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়, তবে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে এই সুবিধাগুলি সীমিত। এখন আমাদের মতো দেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন পণ্য কিনতে বাধ্য হওয়া বাস্তবতা, যা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।
চুক্তির পাল্টা শুল্ক কমানোর বিনিময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং বিমান কিনবে। তবে বোয়িং কেনার বিষয়টি দেশের সামগ্রিক বিমান পরিবহন পরিকল্পনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তা কতটা কার্যকরভাবে বিবেচিত হয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি আর্থিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত যা দেশের বাজেট ও ঋণ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের আগে এই চুক্তি করা হয়েছে। এর ফলে চুক্তির ভার আগামী সরকারের কাঁধে চলে যাবে। ইতিমধ্যেই জাতীয় ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি বোয়িং কেনার জন্য আরও ঋণ নিতে হয়, আর বাণিজ্যিক সুবিধা যথাযথভাবে পাওয়া না যায়, তাহলে চাপ এবং ঝুঁকি আরও বাড়বে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো চুক্তির স্থায়িত্ব। পরবর্তী নির্বাচনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসলে কি এই চুক্তি অব্যাহত থাকবে, নাকি পুনর্বিবেচনা হবে? এমন অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের ব্যবসা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি স্বল্পমেয়াদী স্বস্তি দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছা, আর্থিক সক্ষমতা এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় অপরিহার্য। শুধু বাণিজ্য সুবিধা নয়, এর সঙ্গে জড়িত ঋণ, প্রতিযোগিতা এবং ভলিউম ভিত্তিক ক্রয় পরিকল্পনাও দেশের অর্থনীতি প্রভাবিত করবে।
সারমর্মে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির পাশাপাশি ভবিষ্যতের বোঝা হতে পারে। এটি একদিকে রপ্তানিকে বাড়াতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে ঋণ ও দ্বিপক্ষীয় চাপের কারণে ঝুঁকিও তৈরি করবে। তাই এই চুক্তি বাস্তবায়নের সময় সতর্কতা, সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অপরিহার্য।