এনবিআর ভাগাভাগি এখনই বাস্তবায়ন হয়নি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৪ বার
এনবিআর ভাগাভাগি এখনই বাস্তবায়ন হয়নি

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভাগাভাগির দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা অবশেষে বাস্তবায়িত হতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপের জন্য সমর্থন থাকলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখন দায়িত্ব পুরোপুরি নির্বাচিত সরকারের ওপর এসে পড়েছে।

গত বছরের ১২ মে এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা—এই দুই বিভাগের গঠনের জন্য সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে। উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতি গতিশীল করা এবং দীর্ঘদিনের কর ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা দূর করা। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলনে নামে, যার কারণে দেশের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ১ সেপ্টেম্বর পরিমার্জিত অধ্যাদেশ জারি করে। আন্দোলনকারীদের সাময়িক বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসরসহ বিভিন্ন শাস্তির আওতায় আনা হয়। কিন্তু এনবিআর ভাগাভাগি বাস্তবায়নের পথ এখনও মসৃণ হয়নি। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি সচিব পর্যায়ের বৈঠকেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি। বিভক্ত এনবিআরের দুই বিভাগের সচিব কোন ক্যাডার থেকে নিয়োগ পাবেন—এই প্রশ্নের সমাধান না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া ঝুলে আছে।

পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, “সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এত বড় একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারা বিষয়টি পিছিয়ে দিয়েছে। এই দায়িত্ব এখন আগামী নির্বাচিত সরকারের ওপর চলে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই জটিলতা দূর করতে না পারার দায় অন্তর্বর্তী সরকারকেই নিতে হবে। এটি জাতীয় স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে সরকারের পর্যায়ে প্রয়োজনীয় তৎপরতা দেখা যায়নি।”

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এই ব্যর্থ উদ্যোগ এখন নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা ঘুমন্ত অবস্থায় ঋণফাঁদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এটি রাজনৈতিক সরকারের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। নতুন সরকারকে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যাতে এনবিআরের কর্মকর্তারাও প্রণোদিত ও মানসিকভাবে উৎসাহিত থাকেন।”

এনবিআরকে দুই ভাগ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জড়িত কর্মকর্তাদের জন্য পুনর্বহাল প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। তবে, তাদের বেতন দুই ধাপ কমানো হয়েছে, যা ন্যূনতম লঘু শাস্তি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এনবিআরের কর্মকর্তাদের মানসিক ও প্রফেশনাল স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এই ধাপ গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটি বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এনবিআরের বিভাজন নিয়ে দীর্ঘদিনের এই স্থবিরতা দেশের কর ব্যবস্থাকে জটিল এবং অস্বচ্ছ করে রেখেছে। কর সংগ্রহ ও রাজস্ব নীতি আধুনিকীকরণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় আয়ের নির্ভরতা বেড়ে গেলে দেশের অর্থনীতি ধীরগতিতে এগোতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্বাচিত সরকার যদি বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয় এবং কার্যকর নীতি প্রণয়ন করে, তা দেশের রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করবে।

বিভক্ত এনবিআরের দুই বিভাগের সচিব নিয়োগসহ কার্যক্রমের বাস্তবায়ন ঝুলে থাকার পেছনে প্রশাসনিক কাঠামোর জটিলতাও রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ক্যাডার, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ অনিয়ম এই বিষয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে, সরকারের কোনও পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় পুরো বিষয়টি স্থবির হয়ে পড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা আরও বলেন, রাজস্ব নীতি ও পরিচালনার আধুনিকীকরণ ছাড়া দেশের অর্থনীতি দীর্ষগতিতে এগোতে পারবে না। এনবিআরের কার্যকারিতা বাড়ানো ও কর্মকর্তাদের প্রণোদনা নিশ্চিত করা হলে রাজস্ব আদায় সহজ ও স্বচ্ছ হবে। এটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পরিবেশকেও প্রভাবিত করবে।

এনবিআরের দুই ভাগ নিয়ে ঝুলে থাকা এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুটি মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিকভাবে এটি নির্বাচিত সরকারের জন্য চাপ তৈরি করছে, যেখানে অর্থনৈতিকভাবে দেশের রাজস্ব সংগ্রহ, আমদানি-রফতানি কার্যক্রম এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে প্রভাব পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী নির্বাচিত সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এনবিআরের ভাগাভাগি বাস্তবায়ন করে, তা দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেশের কর নীতি ও রাজস্ব সংগ্রহকে জটিল করে রাখতে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা ও বিশ্লেষকরা একমত যে, সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও প্রণোদনা ছাড়া এনবিআরের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে না। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ছাড়া নীতি পরিবর্তন কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে না। তাই কর্মকর্তাদের উৎসাহিত ও প্রণোদিত রাখা নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত