যুক্তরাষ্ট্রে ৮৬% পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৭ বার
যুক্তরাষ্ট্রে ৮৬% পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রবেশাধিকার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৮৫ থেকে ৮৬ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে। সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। এর আগে সোমবার রাত ১১টায় ওয়াশিংটনে দুই দেশের মধ্যে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল রপ্তানি বাজার। তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। ফলে বাজারটিতে প্রবেশাধিকার সুরক্ষিত রাখা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, নতুন এ চুক্তির মাধ্যমে শুধু রপ্তানি সুবিধাই বাড়বে না, বরং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতিও কমে আসবে।

প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল। ফলে মোট শুল্কহার দাঁড়ায় ৫২ শতাংশের মতো, যা পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয় এবং ১ আগস্ট থেকে তা কার্যকর হয়। সে হিসাবে মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই বাড়তি শুল্ক কমাতে টানা নয় মাসের বেশি সময় ধরে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় চূড়ান্তভাবে এআরটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নতুন চুক্তি অনুযায়ী পারস্পরিক শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। ফলে সামগ্রিক শুল্কহার আগের ৩৫ শতাংশ থেকে কমে ৩৪ শতাংশে দাঁড়াবে। যদিও সংখ্যাগত এই হ্রাস সামান্য, তবে কাঠামোগত দিক থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৬ শতাংশ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য রেসিপ্রোকাল ট্যারিফে প্রবেশ করতে পারবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত এতে বড় সুবিধা পাবে। শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক শূন্য শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পে ব্যবহৃত তুলার প্রায় ৯৮ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আসে। ফলে এই শর্ত বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত পোশাক শূন্য শুল্কে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় একদিকে যেমন রপ্তানি বাড়বে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেও সহায়ক হবে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, যা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার কৃষিপণ্য, জ্বালানি এবং ঐতিহ্যবাহী মেটাল স্ক্র্যাপ আমদানির বিষয়ও বিবেচনা করছে।

চুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট নোটিস দিয়ে বাংলাদেশ এ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোনো সরকার যদি মনে করে চুক্তির শর্তাবলি দেশের স্বার্থের পরিপন্থী, তবে তারা তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ পাবে। এ বিষয়টি নীতিগতভাবে সরকারের কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখবে।

এদিকে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএ চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘ নয় মাসের নিবিড় আলোচনা ও দরকষাকষির পর এ ধরনের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া দেশের রপ্তানি খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা। বিশেষ করে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নামানো এবং মার্কিন তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে শূন্য শুল্ক সুবিধা শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।

তবে বিজিএমইএ জানিয়েছে, চুক্তির চূড়ান্ত শর্তাবলি সম্পর্কে তারা এখনো সম্পূর্ণ অবহিত নয়। সরকারের কাছ থেকে বিস্তারিত নথিপত্র পাওয়ার পর সদস্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করা হবে। পাশাপাশি ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ও ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে। তারা মনে করেন, মার্কিন তুলা গুণগতভাবে উন্নত হলেও তুলনামূলক ব্যয়বহুল। ফলে স্থানীয় স্পিনাররা যদি প্রতিযোগিতামূলক দামে সুতা সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেন, তবে রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এআরটি চুক্তি বাংলাদেশের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক শুল্ক সুবিধা নয়, বরং কৌশলগত বাণিজ্য সম্পর্কের নতুন ভিত্তি স্থাপন করেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশে যখন সুরক্ষাবাদী নীতির প্রবণতা বাড়ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত রাখা একটি বড় সাফল্য। একই সঙ্গে রপ্তানি বৈচিত্র্য ও কাঁচামালের উৎস বহুমুখীকরণের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ৮৬ শতাংশ পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাওয়া দেশের রপ্তানি খাতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যদিও সামগ্রিক শুল্ক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন হয়নি, তবুও কাঠামোগত সুবিধা ও বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির কারণে এটি দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, শিল্পখাত ও নীতিনির্ধারকরা এ সুযোগ কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত