প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তেজনা এবং গণভোটের প্রক্রিয়া বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দেশজুড়ে দৃশ্যমান হয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, গ্রাম ও শহরে ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকক্ষে উপস্থিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় একটি ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে, দেশের ৩২ হাজার কেন্দ্রে বেলা ১১টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণে অংশগ্রহণ করেছে মোট ১৪.৯৬ শতাংশ ভোটার। এ তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, নির্বাচনী দিনের প্রথম দিকে মানুষ সক্রিয়ভাবে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে এগিয়ে এসেছেন।
নির্বাচনের নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশজুড়ে বিশেষ নজরদারিতে নিয়োজিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, মোট ৯ লাখের বেশি পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে রয়েছেন। তাদের লক্ষ্য ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কোনো প্রকার অনাকাঙ্খিত ঘটনা রোধ করা।
জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে ভোট স্থগিত রাখা হয়েছে। এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ছাড়া ৫০টি রাজনৈতিক দল। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি এবং আরও অনেকে রয়েছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এই নির্বাচনকে বলা হচ্ছে দেশের গণতন্ত্রের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
নির্বাচনী দিন সকাল থেকে গ্রামাঞ্চল, শহর ও কলেজ, স্কুল ভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই নির্বাচনে ব্যাপক উৎসাহ দেখিয়েছে। এবারের নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৫ ভোটারের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটারের অংশগ্রহণ আশা করা হচ্ছে। এই উদ্দীপনা দেশের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং নাগরিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।
এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরাও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারছেন। একইসঙ্গে বন্দিরা এবং নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নির্দিষ্ট ব্যবস্থা অনুসারে ভোট দিচ্ছেন। এই প্রক্রিয়ায় প্রবাসী ও বিশেষ অবস্থার ভোটাররা ভোটাধিকারের প্রয়োগে অংশ নিতে সক্ষম হচ্ছেন, যা দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে আরও শক্তিশালী করছে।
শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত থাকলেও অন্যান্য ২৯৯টি আসনে প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র। এবারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী, যার মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য; বিভিন্ন দলের ৬৩ জন নারী প্রার্থী আছেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ২০ জন নারী রয়েছেন। এই পরিসংখ্যান দেশের নির্বাচনে লিঙ্গ সমতার গুরুত্বকে প্রতিফলিত করছে।
নির্বাচনের সময় সশস্ত্র ড্রোন ব্যবহার করে ইসির নজরদারি করা হচ্ছে। শতাধিক ড্রোন নির্বাচনী মাঠে পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম, সহিংসতা বা ভোটপ্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি হওয়া প্রতিরোধ করা যায়। ড্রোন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নির্বাচনী পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গ্রামগঞ্জ থেকে শহরাঞ্চল পর্যন্ত ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে এসে বলেছেন, তাদের দীর্ঘদিনের অধিকার অবশেষে প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক ভোটারই জানিয়েছেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের বিরতির পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়াটা তাদের জন্য আনন্দের এবং দেশের গণতন্ত্রের প্রতি নতুন উদ্দীপনা যোগ করছে। ভোটারদের মধ্যে তরুণদের উপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়েছে।
এছাড়া নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোতে ভোট প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণভাবে চলছে। ভোটকেন্দ্রে ভিড়, সামাজিক দূরত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ভোটাররা ভোটকক্ষে প্রবেশের আগে পরিচয়পত্র দেখাচ্ছেন, প্রিজাইডিং অফিসাররা ভোটার তালিকা যাচাই করছেন, এবং কেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকায় কেন্দ্রের ভিতরে ভোটাররা নিরাপদে ভোট দিতে পারছেন।
বৃহস্পতিবারের নির্বাচনের গুরুত্ব শুধু সংসদ সদস্য নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়। একইদিনে রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পর্কিত গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জনগণ ভোটের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এই ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশের নীতি ও সরকার পরিচালনা। ফলে প্রতিটি ভোটারই দেশের ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধ।
ইসি আশা করছে, ভোটারদের অংশগ্রহণ দিনশেষে আরও বেড়ে যেতে পারে। সকাল ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলা এই নির্বাচনের মধ্যে যতটা সম্ভব শান্তি, স্বচ্ছতা এবং সুষ্ঠু প্রক্রিয়া বজায় রাখা নির্বাচন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য। ইসি নির্বাহীরা জানিয়েছেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্র মনিটরিং করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংক্ষেপে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের সকালটা শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখরভাবে শুরু হয়েছে। বেলা ১১টা পর্যন্ত ১৪.৯৬ শতাংশ ভোট পড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং নির্বাচন কর্মকর্তারা একযোগে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথমবারের মতো ব্যাপক তরুণ ভোটার অংশগ্রহণ এবং প্রবাসীদের পোস্টাল ভোটের ব্যবস্থা নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে দৃঢ় করছে। দেশের গণতন্ত্রে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর এই দিনটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।