প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় গণভোটের দিন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সারা দেশে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। সকাল থেকে কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটকেন্দ্রগুলোতে লাইন দীর্ঘ হতে থাকে। নারী ভোটারদের উপস্থিতি এই সময় চোখে পড়ার মতোভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভোটের উৎসবমুখর পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করেছে।
এই নির্বাচনে ভোটাররা দুটি আলাদা ব্যালট পেপার ব্যবহার করছেন। সাদা ব্যালটে ভোট দিচ্ছেন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের জন্য এবং গোলাপি ব্যালটে গণভোটের জন্য। এবারের নির্বাচনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দীর্ঘ ১৭ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু ভোটের প্রত্যাশা নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগের তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর ভোটাররা নতুন করে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন।
রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ও গণভোট দেশকে নতুনভাবে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেবে। নির্বাচনের এই বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকায় ruling party—আওয়ামী লীগ—এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না।
এদিন ভোটাররা সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট দিতে শুরু করেন। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়ায় কোনো বড় সমস্যা দেখা যায়নি। কেন্দ্রে ভোটারদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে, এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ (হিজড়া) পরিচয়ে ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন। ভোটারদের নিরাপদ ও স্বতন্ত্রভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মোট ৪২ হাজার ৯৫৮টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। ২৯৯ আসনের জন্য প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী রয়েছেন ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮১ জন। নির্বাচনের সঙ্গে এবারই প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা দেশের নাগরিকদের জন্য বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে।
সকাল থেকে ভোট প্রদান করা ভোটাররা বলেন, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পেরেছেন। চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, সিলেটসহ বিভিন্ন শহরের কেন্দ্রে নারী ভোটাররা দীর্ঘ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন। ভোটপ্রাপ্তির সময় সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে ছিল ভোটারদের ব্যালট ব্যবহারের বিষয়ে বিভ্রান্তি। ভোটারদের প্রক্রিয়াটি বোঝাতে প্রিজাইডিং অফিসাররা সাহায্য করেছেন। দুটি ব্যালট থাকায় এবং কিছু ভোটার প্রথমবার ভোট দেওয়ায় প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লেগেছে, তবে ভোটাররা উদারভাবে এ বাধা মোকাবিলা করেছেন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রে গণনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রথমে সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের ব্যালট আলাদা করা হবে। এরপর দুটি ভোটের ফলাফল যুগপৎভাবে গণনা ও ঘোষণা করা হবে। এতে ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং ভোটারদের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশও ভোটের সঙ্গে মিলিত হয়ে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। ভোটের এই দিনটি দেশের নাগরিকদের জন্য কেবল রাজনৈতিক নয়, মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশেষ। ভোটাররা ভোট দিতে এসে একে অপরের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করেছেন। কেন্দ্রে উপস্থিতদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার পরও আনন্দ এবং উৎসাহ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ ভোট দেওয়ার পর সেলফি তুলেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাগ করেছেন।
সারা দেশের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে যে, ভোটগ্রহণ শুরুর প্রথম দিকে ভোটারের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নারীরা নিজেরা দীর্ঘ লাইন ধরে ভোট দেওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ভোটের এই উৎসবমুখর পরিবেশ আগামী প্রজন্মের জন্য গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশে সহায়ক হবে।
বৃহৎ জনগোষ্ঠী অংশগ্রহণ এবং ভোটের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কেন্দ্র পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত থাকায় ভোট প্রক্রিয়ায় কোনো বড় বাধা সৃষ্টি হয়নি। ভোটাররা সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট প্রদান করতে পারায় দেশের গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নির্বাচনের সঙ্গে এই প্রথম গণভোটও ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ ও অংশগ্রহণকে ত্বরান্বিত করেছে।
সংক্ষেপে বলা যায়, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভোটের প্রাথমিক পরিস্থিতি দেশের ইতিহাসে একটি ইতিবাচক নজির হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। লম্বা লাইন, নারী ভোটারদের উৎসাহ, প্রশাসনের সতর্কতা এবং ভোটারদের উদার মনোভাব—এই সব মিলিয়ে এবারের ভোট একটি উৎসবমুখর এবং স্বচ্ছ নির্বাচনের প্রতিচ্ছবি। নির্বাচনের দিনটি শুধু রাজনৈতিক নয়, মানুষের স্বাধীনতা, দায়িত্ববোধ এবং গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা প্রদর্শনের দিন হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ভোটপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রশাসনের কার্যকরী নজরদারি এবং ভোটারদের আত্মবিশ্বাসের মিলনে দেখা যাচ্ছে যে, দেশের গণতন্ত্র নতুন করে শক্তিশালী হচ্ছে। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে নারী ভোটারদের উপস্থিতি এবং সাধারণ ভোটারদের উৎসাহ নির্বাচনের মানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এই দিনটি ইতিহাসে চিহ্নিত হবে ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং দেশের গণতান্ত্রিক শক্তি প্রদর্শনের দিন হিসেবে।