প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন পেরিয়ে ইতিহাসসেরা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নজিরবিহীন ফল অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় নিশ্চিত করে দলটি এককভাবে সরকার গঠনের সাংবিধানিক যোগ্যতা অর্জন করেছে। কেন্দ্র থেকে ঘোষিত ফলাফল এবং সারা দেশ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে যে এবারের ভোট কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচনা।
২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত রয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত ঘোষিত ২৯৬টি আসনের বেসরকারি ফলাফলে বিএনপি ২০৭টিতে জয় পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে, যার মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি ছয়টি আসন পেয়েছে। স্বতন্ত্র ও অন্যান্য প্রার্থীরা ১২টি আসনে জয়লাভ করেছেন। ফলাফল চূড়ান্ত হলে সংখ্যায় সামান্য হেরফের হতে পারে, তবে সামগ্রিক চিত্রে বিএনপির আধিপত্য স্পষ্ট।
এবারের নির্বাচনকে ঘিরে ছিল বিশেষ প্রেক্ষাপট। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে সংস্কারসম্পর্কিত গণভোট। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, গণভোটে ৭৫ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে। সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে প্রায় ৬১ শতাংশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, গণভোটের ফল নতুন সরকারের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজধানীসহ সারা দেশে ভোটগ্রহণ হয়েছে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোট শেষে প্রতিটি কেন্দ্রে গণনা করে রিটার্নিং কর্মকর্তারা ফল ঘোষণা করেন। বহু কেন্দ্রে ভোট উৎসবের আমেজ ছিল ঈদের মতো। ভোটারদের অনেকেই বলেছেন, দীর্ঘ সময় পর এমন নির্ভার পরিবেশে ভোট দিতে পেরে তারা স্বস্তি অনুভব করেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর বলে আখ্যা দিয়েছেন। ভোট প্রদান শেষে তিনি জাতিকে শুভেচ্ছা জানান এবং গণতন্ত্রে উত্তরণের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তার বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুটি আসনেই জয় পেয়েছেন। বগুড়া-৬ আসনে তিনি বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হন। ঢাকা-১৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তীব্র, সেখানে সামান্য ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন। দলীয় সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই দ্বৈত বিজয় তার নেতৃত্বকে সাংগঠনিকভাবে আরও সুদৃঢ় করবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে। দলটির আমির শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে জয়লাভ করেছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। রাজধানীতে তুলনামূলক ভালো ফল তাদের জন্য মনোবল বাড়িয়েছে। সংসদে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়া দলটির রাজনৈতিক কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিছু আসনে ছিল নাটকীয়তা। ঢাকা-৮ আসনে দীর্ঘ বিতর্কের পর বিএনপির মির্জা আব্বাসকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে প্রায় পাঁচ হাজার ভোট বেশি পেয়েছেন। ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী পরাজিত হন এবং জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী জয় পান। ঢাকা-১৩ আসন ঘিরেও অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে নির্বাচন কমিশনে প্রতিনিধিদল অবস্থান নেয়। তবে বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায় উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিএনপির শক্ত অবস্থান। রংপুর, বগুড়া, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের বহু আসনে দলটির প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। একই সঙ্গে জামায়াত উত্তরবঙ্গের কয়েকটি আসনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই ভৌগোলিক বৈচিত্র্য সংসদীয় বিতর্ককে বহুমাত্রিক করতে পারে।
প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে পোস্টাল ব্যালট ব্যবহৃত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭ জন পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় চার লাখ ৭২ হাজার প্রবাসী ভোটার এবং ছয় লাখের বেশি দেশীয় ভোটার রয়েছেন। মোট ভোটারের প্রায় এক শতাংশ এই ব্যবস্থার আওতায় ছিলেন। প্রবাসীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোয় নির্বাচন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।
বিএনপি নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। দলটির নেতারা বলেছেন, জনগণের রায় তাদের কাছে আমানত। অপরদিকে জামায়াতও নির্বাচনকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে ফল মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। উভয় পক্ষের এমন অবস্থান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নতুন সরকারের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি দায়ও বাড়িয়েছে। সাংবিধানিক সংশোধন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এখন তাদের হাতে। একই সঙ্গে শক্তিশালী বিরোধী দল সংসদীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এই নির্বাচন একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। শান্তিপূর্ণ ভোট, উচ্চমাত্রার অংশগ্রহণ এবং গণভোটের সমান্তরাল আয়োজন রাজনৈতিক পরিপক্বতার ইঙ্গিত দেয়। এখন সবার নজর আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা ও নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের দিকে। জনগণের প্রত্যাশা, নতুন অধ্যায়ে স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের ভিত আরও মজবুত হবে।