প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী মঙ্গলবার নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে সরকার গঠনের এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের সরকারপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি এই শপথ অনুষ্ঠানকে এক অনন্য কূটনৈতিক মাত্রা দিয়েছে।
নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ১৩টি দেশের সরকারপ্রধানকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমন্ত্রিত দেশের তালিকায় রয়েছে ভারত, চীন, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ ও ভুটান। এই তালিকা থেকেই স্পষ্ট, নতুন সরকার শুরু থেকেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বার্তা দিতে চায়।
প্রথমবারের মতো নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে ঢাকার ঐতিহাসিক জাতীয় সংসদ ভবন–এর দক্ষিণ প্লাজায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন। সাধারণত রাষ্ট্রপতির দপ্তরে বা সীমিত পরিসরে শপথ অনুষ্ঠিত হলেও এবার তা উন্মুক্ত পরিবেশে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা নতুন সরকারের জনমুখী ভাবমূর্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন। একই দিনে নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, এই দিনটি শুধু একটি সরকার গঠনের দিন নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে ভারতের আমন্ত্রণ ঘিরে আলোচনা সবচেয়ে বেশি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি–কে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ব্যস্ততার কারণে তার ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা কম বলে জানা গেছে। একই দিনে মুম্বাইয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ–এর সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি থাকায় তিনি বিকল্প প্রতিনিধি পাঠাতে পারেন। সম্ভাব্য প্রতিনিধিদের মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর অথবা ভাইস প্রেসিডেন্ট সিপি রাধাকৃষ্ণন–এর নাম আলোচনায় রয়েছে।
একইভাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ–কেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ঐতিহাসিক কারণে সংবেদনশীল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আমন্ত্রণ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই শপথ অনুষ্ঠান শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনার একটি প্রতীকী সূচনা। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তির উপস্থিতি বা প্রতিনিধিত্ব নতুন সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কখনো কখনো উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি নেতৃত্ব আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সংযোগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে এই শপথ অনুষ্ঠান দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রবাসী অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের গুরুত্বকেও তুলে ধরা হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত আছেন, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই শপথ অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় ইতোমধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে, যাতে অনুষ্ঠানটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা যায়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই শপথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন সরকার শুধু দেশের জনগণের কাছেই নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে চাইছে। সেই বার্তাটি হলো—বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল, সহযোগিতামূলক ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র হিসেবে তার যাত্রা অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত।
এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও এই ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে। ভারতের এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির একজন মুখপাত্র বলেছেন, “এই দিনটি বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক। একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে, যা দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার সূচনা করবে।”
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই শপথ অনুষ্ঠান শুধু একটি নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক সূচনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি, জনসম্পৃক্ত আয়োজন এবং নতুন নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি—সবকিছু মিলিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জন্য একটি স্মরণীয় দিন হিসেবে বিবেচিত হতে যাচ্ছে।
নতুন সরকারের সামনে যেমন রয়েছে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ, তেমনি রয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা আরও সুসংহত করার দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে এই শপথ অনুষ্ঠানকে।