ইসরাইলি সেনায় ৫০ হাজারের বেশি দ্বৈত নাগরিক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৩ বার
ইসরাইলি সেনায় ৫০ হাজারের বেশি দ্বৈত নাগরিক

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের অস্থির ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দখলদার রাষ্ট্র ইসরাইল তার সামরিক শক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। দেশটির সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যান নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এতে দেখা গেছে, ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে কর্মরত ৫০ হাজারেরও বেশি সদস্যের বিদেশি নাগরিকত্ব রয়েছে, যা সামরিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইসরাইলের জনপ্রিয় দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনথ–এর এক প্রতিবেদনে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়েছে, ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর মোট ৫০ হাজার ৬৩২ জন সদস্য এমন আছেন, যাদের ইসরাইলি নাগরিকত্বের পাশাপাশি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্বও রয়েছে। এই তথ্য প্রথমবারের মতো এত বিস্তারিতভাবে প্রকাশ্যে এসেছে, যা শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই দ্বৈত নাগরিকত্বধারী সেনাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সদস্যের রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র–এর নাগরিকত্ব। মোট ১২ হাজার ১৩৫ জন সেনার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে। এরপরই রয়েছে ফ্রান্স–এর নাগরিকত্বধারী সেনা, যাদের সংখ্যা ৬ হাজার ১২৭ জন। এছাড়া ৫ হাজারের বেশি সেনাসদস্যের রয়েছে রাশিয়া–এর নাগরিকত্ব।

পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, ৩ হাজারের বেশি সেনাসদস্যের নাগরিকত্ব রয়েছে জার্মানি–এর এবং প্রায় সমসংখ্যক সদস্যের নাগরিকত্ব রয়েছে ইউক্রেন–এর। একইভাবে এক হাজারের বেশি সেনাসদস্যের রয়েছে যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া, পোল্যান্ড, ইথিওপিয়া এবং কানাডা–এর নাগরিকত্ব। এছাড়া আরও বহু দেশের নাগরিকত্বধারী সেনা ইসরাইলি সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছেন।

এতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। প্রায় ৪ হাজার ৪৪০ জন সেনার ইসরাইলি নাগরিকত্বের পাশাপাশি দুটি বিদেশি নাগরিকত্ব রয়েছে। এমনকি ১৬২ জন সেনাসদস্যের রয়েছে তিনটি বিদেশি নাগরিকত্ব। অর্থাৎ তারা একই সঙ্গে চারটি দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত, যা সামরিক ক্ষেত্রে একটি বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই তথ্য প্রকাশের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে স্বচ্ছতা বিষয়ক সংগঠন হাত্সলাখা। সংগঠনটি তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করে এই তথ্য সংগ্রহ করে। তাদের উদ্যোগেই ইসরাইলি সামরিক বাহিনী প্রথমবারের মতো এত বিস্তারিতভাবে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। সংগঠনটির দাবি, এই তথ্য জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, কারণ একটি দেশের সেনাবাহিনীতে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকত্বধারী সদস্য থাকা জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের ইতিহাস ও রাষ্ট্রগঠনের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এই চিত্র কিছুটা স্বাভাবিকও বটে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ইহুদিদের জন্য ইসরাইল একটি ‘জাতীয় আবাসভূমি’ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিরা ইসরাইলে এসে বসবাস শুরু করেন এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। অনেকেই তাদের পূর্ববর্তী নাগরিকত্ব বজায় রাখেন, ফলে তারা দ্বৈত বা একাধিক নাগরিকত্বের অধিকারী হয়ে থাকেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস–এ বিদেশি নাগরিকত্বধারী সদস্যদের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। তবে এবার যে সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে, তা আগের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি। এটি প্রমাণ করে যে, ইসরাইলের সামরিক কাঠামো আন্তর্জাতিকভাবে কতটা বৈচিত্র্যময়।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে এই তথ্যের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর তা প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এটিই ইসরাইলি সামরিক সদস্যদের বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ এবং বিস্তারিত সরকারি পরিসংখ্যান।

ইসরাইলি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটির সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সেনাসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। এছাড়া নিবন্ধিত রিজার্ভ সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ থেকে ৪ লাখ ৬০ হাজারের মধ্যে। অর্থাৎ সক্রিয় বাহিনীর একটি বড় অংশই কোনো না কোনোভাবে বিদেশি নাগরিকত্বের সঙ্গে যুক্ত।

এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, দ্বৈত নাগরিকত্বধারী সেনাদের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি বিশেষ বার্তা বহন করে। এটি ইসরাইলের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরও একটি প্রতিফলন হতে পারে।

অন্যদিকে মানবাধিকার কর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, এই তথ্য ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধ বা সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্বধারী সেনাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তথ্য প্রকাশের ফলে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উভয় ক্ষেত্রেই নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি দেশটির সামরিক বাহিনীর বৈশ্বিক চরিত্রকেও তুলে ধরেছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকত্বধারী সদস্য থাকার বিষয়টি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন। এটি ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, অভিবাসন নীতি এবং বৈশ্বিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং সামরিক নীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত