নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু নিপীড়নের গুজব থমকে গেছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৩ বার
নির্বাচন পর সংখ্যালঘু নির্যাতন নেই

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার ধারা বদলেছে। দীর্ঘদিনের পরিপ্রেক্ষিতে যেখানে প্রতিটি নির্বাচনের পর ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা, হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠত, এবার তা ঘটেনি। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের আগে এবং পরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এবারের ভোটপর্বে বড় কোনো হামলা বা নির্যাতনের ঘটনা মিডিয়াতে বা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েনি।

১৯৯১ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিটি সংসদ নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ নিয়মিতভাবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনের পর দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক মহলে ‘সংখ্যালঘু নির্যাতনের কার্ড’ ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করা হয়েছিল। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সেই সময় এসব অভিযোগকে প্রচার করে চারদলীয় জোট সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেছিল। পরবর্তী নির্বাচনে সরকার বিরোধী অভিযোগে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা বা হামলার ছবি প্রচার করা হতো, যা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

শেখ হাসিনার আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ইতিহাসও এই প্রবণতা নিশ্চিত করে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে অন্তত ৭৬১টি হিন্দু বাড়ি, ১৯৩টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ২৪৭টি মন্দির লক্ষ্যবস্তু হয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের শিকার হয়। নির্বাচনের আগের রাতে যশোরের মালোপাড়া গ্রামে কয়েকশ লোক হিন্দু পরিবারের বাড়িতে আগুন জ্বালায়। বরিশাল, কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।

২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরেও অন্তত ৪৭টি সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করা যায়, এতে আটজন নিহত হন এবং প্রায় ৫৬০ জন আহত হন। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘুদের বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর আসে। সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল, ভয় ও চাপে অনেক ভোটার কেন্দ্রে যেতে দ্বিধা বোধ করেন। সরকারি পক্ষ দাবি করেছিল, অধিকাংশ ঘটনা রাজনৈতিক সংঘর্ষজনিত।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতার ঘটনা আরও বেড়ে মোট দুই হাজার ৪৪২টি রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এ সময় সংখ্যালঘুদের ওপর লক্ষ্যবস্তু সহিংসতা লক্ষ্য করা গেছে। অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছেন বলে কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ পাওয়া যায়। মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রংপুর ও খুলনার এলাকায় উল্লেখযোগ্য হামলার খবর ছিল। পুলিশের তদন্তে প্রায় ৯৮ শতাংশ ঘটনা রাজনৈতিক প্রভাবিত হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখিয়েছে।

তবে সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই ধারাবাহিক সহিংসতা ঘটেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বড় জয় অর্জন করেছে। জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থাকলেও ভোটের পর কোনো হামলা বা নির্যাতনের খবর পাওয়া যায়নি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাচনের আগে তাদের ‘প্রি-ইলেকশন অ্যান্ড রেফারেন্ডাম সিচুয়েশন’ পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছিল যে অর্থ, ধর্ম, সামাজিক গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব নির্বাচনকালীন পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদ ও অধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণেও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা করা হয়েছিল। তবুও এবার নির্বাচনের পরে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শেখ ওমর বলেছেন, এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটেনি বা প্রচার হয়নি। এটি প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী নির্বাচনে যারা সংখ্যালঘু কার্ড ব্যবহার করে প্রোপাগান্ডা চালাতো, তারা এবার নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে ছিল। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সহিংসতার অভাব এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো গুজব ছড়ানো হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহরিয়ার মাহমুদ জানান, প্রধান পার্থক্য হলো আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। তারা দেশে সংখ্যালঘু কার্ড ব্যবহার করে ভোটের রাজনীতি করত। এবারের নির্বাচনে তাদের অনুপস্থিতি এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করায় কোনো কৃত্রিম নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়নি।

নির্বাচন-পরবর্তী এই শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও নির্বাচনের ন্যায়নিষ্ঠা নিশ্চিত হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এবারের নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে সহিংসতা ও ধর্মীয় নির্যাতন ছাড়াই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত