প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দিনাজপুর-৬ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবার দেশের মন্ত্রীসভায় গুরুত্বপূর্ণ আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই তিনি একসঙ্গে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন—মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দলের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্যের স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ডা. জাহিদ হোসেনের পথচলা নতুন নয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১০ সালে তিনি দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন, যা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর ২০১৬ সালে দলের কাউন্সিলে তিনি কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট তাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়, যা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দলের কঠিন সময়গুলোতে তার সক্রিয় ভূমিকা, সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ তাকে নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা মনে করেন, তিনি এমন একজন নেতা যিনি মাঠপর্যায়ে সংগঠন পরিচালনা ও প্রশাসনিক কাজের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম। এ কারণেই নতুন সরকারের মন্ত্রীসভায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দিনাজপুর অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যেও তার মন্ত্রী হওয়া নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা দেখা গেছে। দিনাজপুর জেলা-এর বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট ও হাকিমপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর-৬ আসনে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয়লাভ করেন। ১৯৯টি ভোটকেন্দ্রের ফলাফলে তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৫ হাজার ১১৮ ভোট, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ ৯০ হাজার ৭০৩ ভোট। অর্থাৎ তিনি ১৪ হাজার ৪১৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন, যা ওই আসনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয় ভোটারদের মতে, তিনি নির্বাচনের আগে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন মন্ত্রী হওয়ার ফলে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ আরও বেড়েছে বলে তারা মনে করছেন। অনেকেই আশা করছেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নিজ নির্বাচনী এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং নারী ও শিশুদের কল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একই সঙ্গে দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া সাধারণত সরকারের বিশেষ আস্থার প্রতিফলন। বিশেষ করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ—এই দুটি মন্ত্রণালয় দেশের সামাজিক উন্নয়ন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে এই দায়িত্ব পালনে প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতি নির্ধারণে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা প্রয়োজন। তারা মনে করেন, ডা. জাহিদ হোসেন যদি তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সংগঠনিক দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে এই দুটি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, চিকিৎসক ও শিক্ষক হিসেবে পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, নারী ও শিশুদের সমস্যার বিষয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সচেতন ভূমিকা পালন করে আসছেন। এ কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্ব তার হাতে যাওয়াকে অনেকেই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দিনাজপুর-৬ আসন দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়নবঞ্চিত বলে অভিযোগ রয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এখনও অনেক সম্ভাবনা অপূর্ণ রয়ে গেছে। তারা আশা করছেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে তার প্রভাব ও প্রশাসনিক সংযোগ ব্যবহার করে তিনি এ অঞ্চলে নতুন প্রকল্প আনার চেষ্টা করবেন। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তা কর্মসূচি এবং নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিলে এলাকার সামগ্রিক জীবনমান উন্নত হতে পারে।
রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, তার নিয়োগ দলীয় রাজনীতিতেও নতুন বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে—এমন ধারণা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত সংগঠনের ভেতরে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করবে।
এদিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আরও বাস্তবমুখী। তারা চান, মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি যেন প্রশাসনিক ব্যস্ততার মাঝেও নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এবং তাদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানে পদক্ষেপ নেন। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন, হাসপাতালের মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো—এসব বিষয়কে তারা অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ডা. জাহিদ হোসেনের মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্তি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি তার রাজনৈতিক পথচলার দীর্ঘ অধ্যবসায় ও দলের প্রতি অটল নিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, তিনি এই আস্থার প্রতিদান কতটা কার্যকরভাবে দিতে পারেন এবং তার নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট দুটি মন্ত্রণালয় দেশের সামাজিক উন্নয়নে কতটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।