রাশিয়া–ইউক্রেন শান্তি আলোচনা অগ্রগতি নেই, চাপ বাড়ছে যুদ্ধ থামাতে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১১ বার
জেনেভা আলোচনায় অগ্রগতি নেই, চাপ বাড়ছে যুদ্ধ থামাতে

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সুইজারল্যান্ডের কূটনৈতিক নগরী জেনেভা আবারও আন্তর্জাতিক নজরের কেন্দ্রে উঠে এসেছে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনার কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়াই আকস্মিকভাবে সমাপ্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার বৈঠকের পর উভয় পক্ষের বক্তব্যে ভিন্ন সুর শোনা গেলেও এক বিষয়ে তারা একমত—সংলাপ থামছে না, বরং আরও দফা আলোচনা সামনে আসছে। তবে সেই আলোচনা যুদ্ধবিরতির বাস্তব পথ খুলবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আলোচনাকে “কঠিন” বলে বর্ণনা করে দাবি করেছেন, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে আলোচনার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, মস্কো চাইলে আলোচনাটি ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত, কিন্তু তারা এমন কৌশল নিচ্ছে যাতে সমঝোতার পথ বিলম্বিত হয়। জেলেনস্কির এই মন্তব্য প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই বৈঠক শেষ হয়ে যাওয়াকে অনেক বিশ্লেষক প্রতীকী ঘটনা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আলোচনার টেবিলে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক বক্তব্যেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

রুশ প্রতিনিধিদলের প্রধান আলোচক ভ্লাদিমির মেদিনস্কি অবশ্য ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আলোচনা কঠিন হলেও গঠনমূলক ছিল এবং শিগগিরই নতুন দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে তিনি সম্ভাব্য তারিখ বা স্থান সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু বলেননি। কিয়েভের কর্মকর্তাদের দাবি, বৈঠকটি প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং এতে যুদ্ধবিরতির কাঠামো ও বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ধাপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অপরদিকে একটি রুশ সূত্রের ভাষ্য, বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় ফরম্যাটে আলোচনার সময় ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত গড়িয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরে অনানুষ্ঠানিক দরকষাকষিও চলছিল।

আলোচনাকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর সাম্প্রতিক মন্তব্যে। তিনি বলেন, দ্রুত অগ্রগতি আনতে হলে ইউক্রেনকেই আপসের পথে এগোতে হবে। এ মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলেনস্কি জানান, একতরফাভাবে ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ন্যায্য নয়। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের দোনবাস অঞ্চলের বিতর্কিত ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব এলে তা জনগণ গণভোটে প্রত্যাখ্যান করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে যে অঞ্চলগুলো নিয়ে সংঘাত চলছে, সেগুলোই আলোচনার সবচেয়ে জটিল ইস্যু হয়ে আছে।

ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দলের প্রধান রুস্তেম উমেরভ জানিয়েছেন, আলোচনায় সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের বাস্তব দিক ও কাঠামো নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, উভয় পক্ষই যুদ্ধ থামানোর পথ খুঁজছে, কিন্তু বাস্তবতা ও রাজনৈতিক অবস্থান এতটাই ভিন্ন যে তাৎক্ষণিক সমঝোতা সম্ভব হচ্ছে না। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ মন্তব্য করেন, আলোচনায় “অর্থপূর্ণ অগ্রগতি” হয়েছে এবং সংলাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। তাঁর এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আশাবাদী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাস্তব অগ্রগতি দেখতে হলে লিখিত সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতির ঘোষণাই হবে মূল সূচক।

এই অচলাবস্থার মধ্যেই নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে প্রতিবেশী বেলারুশকে ঘিরে। ইউক্রেন সরকার অভিযোগ করেছে, তাদের নাগরিকদের হত্যায় সহায়তার দায়ে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কিয়েভের এই পদক্ষেপ যুদ্ধের আঞ্চলিক মাত্রা আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ বিশ্লেষকদের মতে, বেলারুশ দীর্ঘদিন ধরে মস্কোর ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং সংঘাতের শুরু থেকেই তাদের ভূখণ্ড ও অবকাঠামো রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সহায়তা দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে ক্রেমলিনপন্থী নিরাপত্তা মহলের পক্ষ থেকেও কঠোর বার্তা এসেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী নিকোলাই পাত্রুশেভ সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিমা দেশগুলো যদি নিষেধাজ্ঞার অংশ হিসেবে রাশিয়ার তেলবাহী জাহাজ জব্দ করার চেষ্টা করে, তবে তা প্রতিহত করতে রুশ নৌবাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে। এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ জ্বালানি রপ্তানি রাশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এবং এই খাতে চাপ বাড়লে মস্কো পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলেও সংলাপ চালু থাকা নিজেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সংঘর্ষ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই মানবিক সংকট গভীর হবে এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে বিশ্বব্যাপী। ইতোমধ্যে যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপে জ্বালানি সংকট, খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং শরণার্থী সমস্যার মতো বহুমাত্রিক প্রভাব দেখা গেছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাইছে অন্তত একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি, যা স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথ খুলতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, আলোচনার টেবিলে যে বিষয়গুলো নিয়ে বিরোধ সবচেয়ে তীব্র, সেগুলোই যুদ্ধের মূল কারণ। সীমান্ত, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, দখলকৃত অঞ্চল, ন্যাটো সম্প্রসারণ এবং নিষেধাজ্ঞা—এসব প্রশ্নে উভয় পক্ষের অবস্থান এখনও প্রায় বিপরীতমুখী। ফলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও দ্রুত সমাধান পাওয়া কঠিন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। তাদের মতে, আপাতত আলোচনার লক্ষ্য হচ্ছে উত্তেজনা কমিয়ে আস্থা তৈরির পরিবেশ তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে বড় সমঝোতার ভিত্তি গড়ে ওঠে।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইন ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলছে। তাই জেনেভার আলোচনার ফলাফল নিয়ে প্রত্যাশা যতটা, ততটাই সংশয়ও রয়েছে। তবুও কূটনীতিকেরা বলছেন, যুদ্ধ থামানোর একমাত্র পথ আলোচনাই—আর সেই পথ যত দীর্ঘই হোক, সেটি খোলা থাকাই সবচেয়ে বড় আশার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত