সিরিয়া ছাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র, শেষ হচ্ছে এক দশকের মিশন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১০ বার
সিরিয়া থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করছে যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে, তারা শিগগিরই সিরিয়া থেকে তাদের সব সেনা প্রত্যাহার করবে। মার্কিন প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিবিএস নিউজ-কে জানিয়েছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে দেশটিতে অবস্থানরত প্রায় এক হাজার মার্কিন সেনাকে ধাপে ধাপে ফিরিয়ে আনা হবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে প্রায় এক দশক ধরে চলা মার্কিন সামরিক উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিন্যাসেরও ইঙ্গিত বহন করে। কারণ ২০১৪ সালে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস-এর উত্থানের সময় সিরিয়ায় মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল মূলত সন্ত্রাসবাদ দমন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। সে সময় প্রায় দুই হাজার সেনা পাঠানো হয়েছিল, যারা বিভিন্ন ঘাঁটিতে অবস্থান নিয়ে আইএসের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যা কমিয়ে বর্তমানে প্রায় এক হাজারে নামিয়ে আনা হয়েছে, আর এখন তা পুরোপুরি প্রত্যাহারের পথে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আইএস এখনও বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হলেও পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “এক সময় এই গোষ্ঠীর বিস্তার রোধে আমাদের সরাসরি উপস্থিতি জরুরি ছিল। কিন্তু এখন সিরিয়ায় রাজনৈতিক কাঠামো তুলনামূলক স্থিতিশীল এবং আইএসের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তাই আমরা বাহিনী ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, সেনা প্রত্যাহার মানেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা নয়। বরং তারা বলছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র আগের মতোই সক্রিয় থাকবে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম থাকবে। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা আরও জানান, ইতোমধ্যে কিছু ঘাঁটি থেকে সেনা ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সিরীয় সরকারের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এতে স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়বে বলে তারা মনে করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক কৌশলগত কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছিল। দ্বিতীয়ত, বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে সরে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি উপস্থিতি কমানোর কৌশল গ্রহণ করছে ওয়াশিংটন। তৃতীয়ত, সিরিয়ায় রাশিয়া ও ইরানের প্রভাব বৃদ্ধির ফলে সেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আগের মতো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না—এমন মতও দিয়েছেন কিছু আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

তবে এই ঘোষণাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে এবং এতে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর প্রভাব বাড়তে পারে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একটি অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, মার্কিন সেনা সরে গেলে আইএসের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে যেখানে স্থানীয় বাহিনীর সক্ষমতা সীমিত।

সিরিয়ার সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে বিদেশি সেনা উপস্থিতি অনেকের কাছে নিরাপত্তার প্রতীক হলেও অন্যদের কাছে তা সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। ফলে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে কেউ স্বস্তি প্রকাশ করছেন, আবার কেউ ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে পরবর্তী কয়েক মাসে, যখন সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া বাস্তবে সম্পন্ন হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বৃহত্তর চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উপস্থিতি এমন অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত করতে চাইছে, যেখানে তাদের কৌশলগত স্বার্থ সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে জনমত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।

সব মিলিয়ে সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি সামরিক মিশনের সমাপ্তি নয়, বরং একটি যুগের সমাপ্তির ইঙ্গিতও বহন করছে—যে যুগে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের নামে দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। এখন বিশ্ব নজর রাখছে, এই প্রত্যাহার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করবে নাকি নতুন অনিশ্চয়তার দ্বার খুলে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত