প্রকাশ: ১৬ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা কর্ণফুলী টানেলপ্রান্তের বিলাসবহুল অতিথিশালাটি অবশেষে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির নতুন উপায় হিসেবে পর্যটন খাতে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন এই স্থাপনাটি এবার ৩০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হচ্ছে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে, যা বিদেশি পর্যটকদের জন্য এক নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা প্রান্তে অবস্থিত এই ‘সাত তারকা’ মানের সার্ভিস এরিয়া কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের প্রাথমিক নকশায় ছিল না। পরবর্তীতে এটিকে প্রকল্পে যুক্ত করে গড়ে তোলা হয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ একটি অবকাঠামো, যাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ব্যবহারবিহীন পড়ে থাকার কারণে এটি একপ্রকার রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের প্রতীক হিসেবে আলোচনায় আসে।
সেতু বিভাগ জানায়, এই সার্ভিস এরিয়ায় রয়েছে পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি বিলাসবহুল বাংলো, ৩০টি রেস্টহাউজ ও বিশ্রামাগার, সম্মেলন কেন্দ্র, জাদুঘর, রেস্তোরাঁ, হেলিপ্যাড, সুইমিংপুল, জিম, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ফায়ার স্টেশন, পুলিশ ফাঁড়ি, টেনিস কোর্ট এবং দু’টি দৃষ্টিনন্দন সেতুসহ আরও নানা আধুনিক স্থাপনা। পুরো এলাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, যার সক্ষমতা ১,১৮২ টন। এসব স্থাপনা ইজারাদারকে হস্তান্তর করা হবে ‘যেমন আছে’ ভিত্তিতে। ইজারাদার বার্ষিক ভাড়া চার কিস্তিতে পরিশোধ করবেন এবং হোটেল, কনফারেন্স, ট্যুর ও রুম সার্ভিসসহ নানা সেবা চালু করে নিজস্ব মুনাফা করতে পারবেন।
১ জুলাই থেকে এই ইজারা প্রক্রিয়ার দরপত্র আহ্বান শুরু হয়েছে, যা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৭ আগস্ট। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সরকার আশা করছে, বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার পাশাপাশি অব্যবহৃত স্থাপনাটির মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব হবে।
এই অতিথিশালার পাশে অবস্থিত পারকি সমুদ্রসৈকত দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং মানসম্পন্ন সেবার অভাবে পর্যটনের মূলধারায় আসতে পারেনি। যদিও এখানে পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা দীর্ঘদিন আগে দেওয়া হলেও ছয় বছরের ব্যবধানে তা আলোর মুখ দেখেনি। সেক্ষেত্রে কর্ণফুলীর এই আধুনিক সার্ভিস এরিয়াটি বেসরকারি পর্যটন খাতে চালু হলে পারকিসৈকত ঘিরে নতুন গতি সঞ্চারিত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার বলছে, টানেলের প্রতিদিন গড়ে ৩৭ লাখ টাকা রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হলেও আয় মাত্র ১০ লাখ টাকা। লোকসান কমিয়ে আয়ের নতুন পথ তৈরি করতেই সার্ভিস এরিয়াকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রাম সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, “এই প্রকল্পটি একটি বড় শিক্ষা হওয়া উচিত। অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা তৈরির আগে সরকারি সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভালোভাবে মূল্যায়ন প্রয়োজন ছিল।”
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানান, “স্বচ্ছ দরপত্রের মাধ্যমে এই স্থাপনাগুলো হোটেল, মোটেল বা পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলে একদিকে যেমন জনগণ উন্নত সেবা পাবে, অন্যদিকে সরকার রাজস্ব আয় বাড়াতে পারবে।”
টানেল প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, “বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে লোকসান কমিয়ে ভবিষ্যতে এই এলাকা পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে বলেই আমাদের আশা।”
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কর্ণফুলী টানেলের ভবিষ্যৎ কেবল একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়, বরং এক অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেশের সামনে দাঁড়াতে পারে।