যান্ত্রিক চাপে হারাচ্ছে কৃষকের পুরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২২ বার
কৃষকের পুরা ঐতিহ্য হারাচ্ছে

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শীত এলেই একসময় গ্রামবাংলার উঠোনে চোখে পড়ত খড়ের সুউচ্চ স্তূপ, যাকে স্থানীয়রা স্নেহভরে বলতেন ‘কৃষকের পুরা’। এটি ছিল শুধু খড়ের গাদা নয়, বরং গ্রামীণ জীবনযাত্রার এক বহুমাত্রিক প্রতীক। ধান কাটার মৌসুম শেষে কৃষক পরিবারগুলো খড়, নাড়া ও তুষ জড়ো করে যত্নসহকারে তৈরি করতেন এই পুরা। সেই পুরা ছিল জ্বালানি, পশুখাদ্য সংরক্ষণাগার, বর্ষার দিনের নির্ভরযোগ্য আগুনের উৎস এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির এক জীবন্ত চিহ্ন। কিন্তু আধুনিকতার প্রবাহে সেই পরিচিত দৃশ্য এখন দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে, আর নতুন প্রজন্মের অনেকেই শব্দটি পর্যন্ত শোনেনি।

গ্রামের প্রবীণদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে এক ভিন্ন সময়ের গল্প। তারা জানান, ধান ঘরে তোলার পর পুরা বানানো ছিল এক ধরনের উৎসবমুখর পারিবারিক আয়োজন। বাড়ির নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী সবাই মিলে খড় সাজিয়ে গোল বা চৌকো আকারে গড়ে তুলতেন পুরা। কেউ খড় এনে দিত, কেউ স্তূপ সাজাত, আবার কেউ বাঁধন দিত যাতে বাতাসে উড়ে না যায়। কাজের ফাঁকে গল্প, হাসি আর গান—সব মিলিয়ে এটি ছিল গ্রামীণ সামাজিকতার এক অনন্য অধ্যায়। শীতের ভোরে সেই পুরার আগুনে পিঠা বানানো কিংবা সন্ধ্যায় উনুন ঘিরে গল্প করার স্মৃতি আজও তাদের কণ্ঠে আবেগ জাগায়।

এক সময় গ্রামীণ জীবনে জ্বালানি সংগ্রহ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। গাছের ডাল বা কাঠ সবসময় সহজলভ্য ছিল না। তখন পুরাই ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানির উৎস। শুকনো খড় ও তুষ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এটি সহজে আগুন ধরত এবং দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলত। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন ভেজা কাঠে আগুন ধরানো কঠিন হতো, তখন পুরার শুকনো অংশ কেটে এনে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হতো। একই সঙ্গে গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে খড় সংরক্ষণের জন্যও এটি ছিল কার্যকর পদ্ধতি। অর্থাৎ একটিমাত্র কাঠামোই পূরণ করত একাধিক প্রয়োজন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষির ধরন বদলে গেছে। এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধান কাটার কাজে ব্যবহার হচ্ছে আধুনিক কম্বাইন হারভেস্টার। এই যন্ত্র ধান কাটার পাশাপাশি খড় কেটে ছোট ছোট টুকরো করে মাঠেই ফেলে রাখে বা সরাসরি সংগ্রহের সুযোগ কমিয়ে দেয়। ফলে কৃষকের ঘরে আগের মতো খড় জমা হয় না। অনেক সময় খড় মাঠেই পচে যায় কিংবা বিক্রি হয়ে যায় শিল্পকারখানা বা পশুখাদ্য প্রস্তুতকারীদের কাছে। এতে পুরা তৈরির উপকরণই আর থাকে না।

একই সঙ্গে গ্রামীণ জ্বালানি ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে রান্নার প্রধান মাধ্যম ছিল খড়, লাকড়ি বা শুকনো গোবর, সেখানে এখন অনেক বাড়িতেই গ্যাস সিলিন্ডার, বিদ্যুৎচালিত চুলা বা আধুনিক জ্বালানি ব্যবস্থার ব্যবহার বেড়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা কমেছে। জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ায় মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সহজ ও দ্রুত পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে। এতে সময় বাঁচছে, শ্রম কমছে, কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের গ্রামীণ ঐতিহ্য।

কৃষিবিদ লিটন কুমার ঢালী মনে করেন, পুরা শুধু একটি ঐতিহ্য নয়; এটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি সংস্কৃতির অংশ ছিল। তার মতে, খড় ও তুষ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে তা জৈব সার হিসেবেও ব্যবহার করা যেত, যা মাটির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করত। আধুনিক কৃষিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়লেও প্রাকৃতিক উপাদানের গুরুত্ব এখনও অস্বীকার করা যায় না। তিনি বলেন, উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু ঐতিহ্যকে পুরোপুরি বিসর্জন দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের শিকড় সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাবে।

সংস্কৃতিবিদদের মতে, গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক উপাদানই ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। তারা বলছেন, নগরকেন্দ্রিক উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। এখন গ্রামের তরুণদের অনেকেই শহরমুখী, ফলে তারা স্থানীয় সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ পায় না। পুরা তৈরির মতো শ্রমসাধ্য কাজ শেখানোর মতো পরিবেশও নেই। ফলে প্রজন্মান্তরে এই জ্ঞান স্থানান্তর হচ্ছে না। তারা মনে করেন, স্কুল-কলেজে লোকজ ঐতিহ্য নিয়ে পাঠ, প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি বাড়ানো গেলে অন্তত ঐতিহ্যের স্মৃতি ধরে রাখা সম্ভব।

গ্রামের প্রবীণদের কাছে পুরা মানে শুধু একটি জ্বালানির স্তূপ নয়, বরং একটি সময়ের প্রতীক। তারা বলেন, পুরা ছিল ঘরের সমৃদ্ধির চিহ্ন। যার উঠোনে যত বড় পুরা, তাকে তত সচ্ছল কৃষক হিসেবে ধরা হতো। এটি সামাজিক মর্যাদারও প্রতীক ছিল। শীতের সকালে পুরার পাশে বসে গল্প করা বা শিশুদের খেলাধুলা—এসব দৃশ্য এখন স্মৃতির পাতায় বন্দি। অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন, আধুনিক যন্ত্র আমাদের জীবন সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু অনেক আনন্দ কেড়ে নিয়েছে।

পরিবেশবিদরা মনে করেন, ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির অনেকগুলোর মধ্যেই পরিবেশবান্ধব দিক ছিল, যা আধুনিক প্রযুক্তিতে সবসময় পাওয়া যায় না। পুরা ছিল পুনর্ব্যবহারযোগ্য কৃষি উপকরণের একটি উদাহরণ, যেখানে ধানের অবশিষ্টাংশ অপচয় না হয়ে কাজে লাগত। বর্তমান সময়ে যখন পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি বিশ্বব্যাপী আলোচিত, তখন এমন টেকসই পদ্ধতির গুরুত্ব নতুনভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, উন্নয়ন ও ঐতিহ্যকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবার সুযোগ নেই। বরং দুটিকে সমন্বয় করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করছে, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য জরুরি। তবে একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় জাদুঘর, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বা গ্রামীণ পর্যটন উদ্যোগে পুরার মতো ঐতিহ্য তুলে ধরা গেলে তা নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত হতে পারে।

গ্রামীণ সমাজের অনেকেই মনে করেন, দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতে পরিবর্তন থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু সচেতনতা থাকলে ঐতিহ্যকে পুরোপুরি হারাতে হয় না। তাদের মতে, প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি যদি মানুষ নিজের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখায়, তাহলে পুরার মতো ঐতিহ্য অন্তত স্মৃতি থেকে মুছে যাবে না। তারা চান, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানুক—এক সময় এই বাংলার মাঠে-ঘাটে, উঠোনে উঠোনে খড়ের সেই সোনালি স্তূপ দাঁড়িয়ে থাকত, যা ছিল কৃষকের শ্রম, মাটির ঘ্রাণ আর পারিবারিক বন্ধনের প্রতীক।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আধুনিকতার যাত্রাপথে দাঁড়িয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘কৃষকের পুরা’ যেন সময়ের স্রোতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল একটি কৃষি উপকরণের হারিয়ে যাওয়া নয়; বরং একটি জীবনধারা, এক ধরনের সামাজিক সংস্কৃতি এবং গ্রামীণ আত্মপরিচয়ের ক্ষয়। উন্নয়নের গতি থামানো যাবে না, তবে সেই গতির সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই হবে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ—বিশেষত বাংলাদেশ-এর মতো ঐতিহ্যসমৃদ্ধ দেশে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত