রমজানে গ্যাস সংকট তীব্র, দেশজুড়ে দুর্ভোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৩ বার
রমজানে গ্যাস সংকট তীব্র, দেশজুড়ে দুর্ভোগ

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সারাদেশে গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ এবং সরবরাহ ঘাটতির কারণে রমজান মাসে সাধারণ মানুষ থেকে শিল্প ও সিএনজি ব্যবহারকারীরা সবদিকেই দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন। ঢাকার মগবাজারের বাসিন্দা সামান্তা রহমান জানান, গত প্রায় চার মাস ধরে দিনের বেলা গ্যাস থাকে না। রাতে কিছুটা পাওয়া গেলেও চাপ নেই, ফলে ইফতার ও সাহ্‌রির খাবার তৈরি করতে ভোগান্তি নিতে হচ্ছে। অনেকে বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা কিনতে বাধ্য হয়েছেন।

ঢাকার বনশ্রীর ব্লক-ডি এলাকার বাসিন্দা নাহিদ হাসান জানিয়েছেন, মাঝরাতে গ্যাস এসে সাহ্‌রির রান্না করতে হয়, আর দিনের বেলা চুলা ব্যবহার অপ্রতুল থাকে। মিরপুর ১০-এর বি-ব্লকের বাসিন্দা মাকসুদুর রহমান বাচ্চুও বলেন, গত চার মাস ধরে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গ্যাস থাকে না, রান্না কার্যক্রম কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশের বৃহত্তর শহরগুলোর মতো শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানিয়েছেন, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ালে বিদ্যুতে কম পড়ে, বিদ্যুতে দিলে আবাসিক চাপ কমে। ফলে সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় হলো উৎপাদন বাড়ানো।

গ্যাসের স্বল্পচাপে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। অনেক চালক অর্ধেক সিলিন্ডার নিয়ে ফিরছেন। রাজধানীর মগবাজার, মহাখালী, রামপুরা ও আশপাশের স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। তেজগাঁও এলাকার অটোরিকশাচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পুরো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, এতে আয়ও কমছে।

শিল্পখাতের প্রভাবও মারাত্মক। সাভারের ডিইপিজেডে এফসিআই বিডি কারখানার মেইনটেন্যান্স ম্যানেজার মোখলেছুর রহমান বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে বয়লার ও যন্ত্র চালানো যাচ্ছে না। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করা হচ্ছে, যা খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি করছে। অকোটেক্স গ্রুপের সহকারী মহাব্যবস্থাপক হোসাইন খালেকও বলেন, গ্যাস না থাকায় কারখানা একপ্রকার বন্ধ, কিছু কিছু ইউনিট ডিজেল ব্যবহার করে চালানো হচ্ছে যা গ্যাসের চেয়ে ছয়গুণ ব্যয়বহুল।

এলপিজির বাজারেও বিশৃঙ্খলা চলছে। সরকারের নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০–৫০০ টাকা বেশি দিয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের খালিদ হোসেন জানিয়েছেন, সিলিন্ডারের দাম গত মাসে ২৪০০ টাকা ছিল, এখন কমে ১৮০০ টাকা হলেও সরকারি দাম ১৩০৬ টাকা।

সরকারি উদ্যোগে রমজানে সিএনজি স্টেশন বন্ধের সময় বাড়ানো হয়েছে। পূর্বে বিকেল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা বন্ধ থাকলেও এখন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টা বন্ধ রাখা হচ্ছে। এটি কার্যকর থাকবে ১৪ মার্চ পর্যন্ত। ঈদে মহাসড়কে যাত্রী চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে ১৫ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সিএনজি স্টেশন সার্বক্ষণিক খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুতের চাহিদা ও গ্যাসের ঘাটতির সংযোগও উদ্বেগজনক। দেশীয় উৎপাদনের মাত্রা ২০১৭ সালের ২৭০ কোটি ঘনফুট থেকে কমে বর্তমানে ১৮০ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। দেশে বিদ্যুতের ৬০ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হয়, যা বর্তমানে অপর্যাপ্ত। এ পরিস্থিতিতে লোডশেডিংয়ের সম্ভাবনা রয়ে গেছে।

বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনায় দেশের ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি কূপ খনন ও ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। কুতুবজোম এলাকায় চতুর্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের গ্যাস সংকট সমাধানের জন্য আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম উল্লেখ করেছেন, দেশে গ্যাসের সম্ভাবনা এখনও উজ্জ্বল, দ্রুত অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খনন শুরু করা জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ মানুষ, শিল্প ও পরিবহন খাতের জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উদ্যোগ ও নতুন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে রমজান ও গ্রীষ্মকালের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত