প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বর্ণবাজারে আবারও মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে, যা সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবাইকে নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে। বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারেও সোনার দাম বেড়েছে। এর ফলে ভালো মানের ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিপ্রতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা, যা আগের দিনের তুলনায় ৩ হাজার ২৬৫ টাকা বেশি। নতুন এই মূল্য শনিবার থেকে কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
বাজুসের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনা বা পিওর গোল্ডের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে এর পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার মূল্যবৃদ্ধি। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই নতুন এই মূল্য নির্ধারণ করতে হয়েছে।
নতুন মূল্য অনুযায়ী, ২১ ক্যারেট সোনার দাম ভরিপ্রতি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ১০১ টাকা। একইভাবে ১৮ ক্যারেট সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৭৫৯ টাকা। অন্যদিকে, সনাতনী পদ্ধতির সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ভরিপ্রতি ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৮ টাকা। এর সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়ে ক্রেতাদের আরও বেশি দাম গুনতে হবে। ফলে বাস্তবে একজন ক্রেতার জন্য সোনা কেনা আগের তুলনায় আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের স্বর্ণবাজার এখন পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিশ্ববাজারে যখন দাম বাড়ে, তখন দেশের বাজারেও তা বাড়ে। আবার বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও কিছুটা স্বস্তি আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ব্যাপক ওঠানামা করছে, যা দেশের বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
গত কয়েক সপ্তাহের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জানুয়ারির শেষ দিক থেকেই সোনার দামে বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়। এমনও ঘটনা ঘটেছে, সকালে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, আবার রাতে তা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২৯ জানুয়ারি সোনার দাম একদিনেই ভরিপ্রতি ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বেড়ে যায়। তখন দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়, যা একটি নতুন রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তীতে বিশ্ববাজারে কিছুটা দাম কমায় দেশের বাজারেও সোনার দাম কমানো হয়েছিল। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসলে দুই দফায় দেশের বাজারে দাম কমানো হয়। এতে দুই দিনে ভরিপ্রতি ৫ হাজার ৪৮১ টাকা পর্যন্ত কমে যায়। এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেয়েছিলেন ক্রেতারা। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি।
কারণ গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও সোনার দাম বাড়তে শুরু করে। একদিনেই আউন্সপ্রতি প্রায় ১২৯ ডলার বেড়ে যায়। ফলে সোনার দাম আবার পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। সেই ধারাবাহিকতায় বাজুস নতুন করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিও সোনার দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি এবং বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মান ওঠানামার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে সোনার চাহিদা বাড়ছে এবং দামও বাড়ছে।
গত এক মাসের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে সোনার দাম মোট ৬৯ ডলার বেড়েছে। আর গত ছয় মাসে এই বৃদ্ধি আরও বেশি, প্রায় ১ হাজার ৬৪০ ডলার। এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি সোনাকে আরও মূল্যবান করে তুলেছে। একই সঙ্গে এটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বাড়ার কারণে বিক্রি কিছুটা কমে গেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ক্রেতারা এখন সোনা কেনার ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক হচ্ছেন। বিয়ের মৌসুমেও আগের মতো বিক্রি হচ্ছে না। অনেকেই প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও উচ্চ মূল্যের কারণে সোনা কেনা থেকে বিরত থাকছেন।
অন্যদিকে, যারা বিনিয়োগের জন্য সোনা কিনতেন, তারাও এখন কিছুটা দ্বিধায় আছেন। কারণ দাম অনেক বেশি হওয়ায় ভবিষ্যতে দাম কমলে লোকসানের আশঙ্কা থাকে। তবে কিছু বিনিয়োগকারী মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে সোনার দাম আরও বাড়তে পারে।
সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিয়ের জন্য সোনা কেনার পরিকল্পনা করা পরিবারগুলো বেশি সমস্যায় পড়ছেন। কারণ বাংলাদেশে বিয়ের অনুষ্ঠানে সোনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দেশের বাজারেও সোনার দামের অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আগামী দিনগুলোতে সোনার দাম আরও বাড়তে বা কমতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণবাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। ক্রেতা, ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারী—সবাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। কেউই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না, আগামী দিনগুলোতে সোনার দাম কোন দিকে যাবে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, বিশ্ববাজারের প্রভাব থেকে দেশের স্বর্ণবাজার আলাদা নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য পরিবর্তন হলেও তার প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ে। ফলে দেশের সোনার দাম এখন অনেকটাই বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক সময় নির্বাচন করা। কারণ ভুল সময়ে কিনলে বাড়তি দাম গুনতে হতে পারে। অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের জন্যও এটি একটি কঠিন সময়, কারণ দাম বেশি হলে বিক্রি কমে যায়।
সব মিলিয়ে, সোনার এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। এখন সবার নজর বিশ্ববাজারের দিকে, কারণ সেখানকার পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে দেশের সোনার ভবিষ্যৎ দাম।