নতুন স্নায়ুযুদ্ধ চান না ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৬ বার
নতুন স্নায়ুযুদ্ধ চান না ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে ‘স্নায়ুযুদ্ধের’ আশঙ্কা নিয়ে যখন নানা আলোচনা চলছে, তখন সেই সম্ভাবনার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ব্রাজিল-এর এই প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, তার দেশ কোনোভাবেই নতুন স্নায়ুযুদ্ধ চায় না এবং বিশ্বকে বিভক্তির পথে নয়, বরং সহযোগিতার পথে এগিয়ে যেতে হবে।

ভারত সফর শেষে নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তিনি সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর উদ্দেশে বার্তা দিয়ে বলেন, ব্রাজিল এমন কোনো বিশ্বব্যবস্থা চায় না যেখানে দেশগুলো পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবে। বরং প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাকে সম্মান জানিয়ে সমান আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।

লুলা বলেন, বিশ্ব এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আবারও তীব্র হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলতে চাই, আমরা কোনো নতুন স্নায়ুযুদ্ধ চাই না। আমরা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চাই না। আমরা চাই সব দেশকে সমানভাবে মূল্যায়ন করা হোক।”

তার এই বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক ভাষণ নয়, বরং ব্রাজিলের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরে। লুলা দীর্ঘদিন ধরেই বহুপাক্ষিকতা, সংলাপ এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষে কথা বলে আসছেন।

আগামী মার্চের প্রথম সপ্তাহে লুলার সঙ্গে ওয়াশিংটনে বৈঠকের কথা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। এই বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। লুলা জানিয়েছেন, এই বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অভিবাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনা করা হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বৈঠক শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বরং বৃহত্তর বৈশ্বিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ব্রাজিল শুধু লাতিন আমেরিকার একটি বড় অর্থনীতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবেও পরিচিত।

তবে দুই নেতার মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, গাজা যুদ্ধ এবং নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থান এক নয়। এছাড়া ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘শান্তি পর্ষদ’ নিয়েও লুলার কিছু সংরক্ষণ রয়েছে বলে জানা গেছে।

লুলা বরাবরই আন্তর্জাতিক বিরোধের ক্ষেত্রে সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। তিনি মনে করেন, সামরিক প্রতিযোগিতা বা শক্তির প্রদর্শন বিশ্বকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। তার মতে, বিশ্বকে এমন একটি পথে এগিয়ে যেতে হবে, যেখানে সহযোগিতা, উন্নয়ন এবং মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লুলার এই বক্তব্য বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য বড় শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিকে অনেকেই নতুন ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হিসেবে দেখছেন।

ঐতিহাসিকভাবে ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ বলতে বোঝায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামরিক ও আদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যদিও সেই স্নায়ুযুদ্ধ ১৯৯১ সালে শেষ হয়, তবে বর্তমান বিশ্বে আবারও বড় শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই আশঙ্কা নতুন করে সামনে এসেছে।

লুলার মতে, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিযোগিতা নয়, বরং সহযোগিতার মাধ্যমেই বিশ্বকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তিনি আরও বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন।

তার এই অবস্থান লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ এই অঞ্চলের অনেক দেশই বড় শক্তিগুলোর প্রভাবের মধ্যে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণের চেষ্টা করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লুলা নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন, যিনি বিশ্ব রাজনীতিতে ভারসাম্য এবং সংলাপের পক্ষে অবস্থান নেন। তার এই অবস্থান ব্রাজিলের আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরও বাড়াতে পারে।

এদিকে আসন্ন ট্রাম্প-লুলা বৈঠক নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই বৈঠক ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের সম্পর্কের নতুন দিক নির্দেশনা দিতে পারে।

বিশ্ব যখন নানা সংঘাত, প্রতিযোগিতা এবং বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন লুলার মতো নেতাদের শান্তি ও সহযোগিতার আহ্বান অনেকের কাছে আশার বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তার বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং একটি বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যেখানে বিশ্বকে বিভক্তির পরিবর্তে ঐক্যের পথে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এখন দেখার বিষয়, আসন্ন বৈঠকে এই দৃষ্টিভঙ্গি কতটা বাস্তব রূপ পায় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের সম্পর্ক কোন পথে এগিয়ে যায়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, ব্রাজিল বর্তমান বিশ্বে একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত