প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গৌরবময় ঐতিহ্যকে নতুন করে উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে রাজধানীজুড়ে। মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারির আবহে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠান এবং একই দিনে শুরু হবে বাঙালির প্রাণের উৎসব অমর একুশে বইমেলা। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন উদ্বোধন ও পদক প্রদান করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালেই রাজধানীতে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নির্বাচিত গুণীজনদের হাতে একুশে পদক তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী। বিকেলে তিনি উপস্থিত থাকবেন রাজধানীর ঐতিহাসিক বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে, যেখানে তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবারের অমর একুশে বইমেলার যাত্রা।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দুটি অনুষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আয়োজন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, একুশে পদক শুধু একটি পুরস্কার নয়, এটি জাতির কৃতজ্ঞতার প্রতীক। দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প, সমাজসেবা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই পদক প্রদান করা হয়।
প্রতি বছরই একুশে পদককে ঘিরে দেশজুড়ে থাকে গভীর আগ্রহ ও আবেগ। এই পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কেবল তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদান রাখেননি, বরং দেশের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের ধারক হয়ে উঠেছেন। অনেকেই মনে করেন, এই সম্মাননা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে এবং তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও সৃজনশীলতার চেতনা জাগিয়ে তোলে।
একই দিনে বিকেলে শুরু হবে অমর একুশে বইমেলা, যা বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত। ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে জন্ম নেওয়া এই বইমেলা এখন কেবল বই কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি হয়ে উঠেছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের উৎসব।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং এর আশপাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে ইতোমধ্যে বইমেলার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্টল নির্মাণ, আলোকসজ্জা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে দিনরাত কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবারের বইমেলার একটি বিশেষ দিক হলো, অংশগ্রহণকারী প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্টলভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করেছে সরকার। প্রকাশকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত দেশের প্রকাশনা শিল্পের জন্য একটি বড় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। অনেক ছোট ও নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, যারা আগে উচ্চ ভাড়ার কারণে অংশ নিতে দ্বিধায় থাকতেন, এবার তারা আরও উৎসাহ নিয়ে অংশ নিচ্ছেন।
প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের এই উদ্যোগের ফলে বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা এবং বৈচিত্র্য আরও বাড়বে। পাঠকেরা নতুন লেখক ও নতুন ধরণের বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
বইমেলা শুধু লেখক ও প্রকাশকদের জন্য নয়, পাঠকদের জন্যও একটি আবেগের জায়গা। নতুন বইয়ের গন্ধ, প্রিয় লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে বইমেলা হয়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক উৎসব।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বইমেলাকে ঘিরে থাকে আলাদা উত্তেজনা। অনেকেই সারা বছর অপেক্ষা করেন এই সময়টির জন্য, যখন তারা তাদের পছন্দের বই সংগ্রহ করতে পারেন এবং সাহিত্যজগতের মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।
সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে বইমেলা আয়োজন করা হয়, যাতে নতুন প্রজন্ম ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার প্রতীক।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, যানবাহন চলাচল এবং সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বইমেলায় প্রতিদিন বিভিন্ন আলোচনা, সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এতে দেশের প্রখ্যাত লেখক, গবেষক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অংশ নেবেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই দুটি অনুষ্ঠান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বইমেলার উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি লেখক, প্রকাশক এবং পাঠকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে।
দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই মনে করছেন, এই আয়োজন দেশের সংস্কৃতিচর্চা এবং সাহিত্যচর্চাকে আরও এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ফেব্রুয়ারির এই আয়োজন কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংগ্রাম এবং সৃজনশীলতার প্রতীক। ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতি বছর বইমেলা এবং একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠান নতুন করে জাতিকে তার শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে।
আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি তাই কেবল একটি তারিখ নয়, এটি হবে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের আরেকটি স্মরণীয় দিন।