প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানজুড়ে প্রাণঘাতী বিক্ষোভের এক মাস পেরোনোর পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুনরায় খোলার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ আবারও জোরালোভাবে ফিরে এসেছে। রোববার দেশটির শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সরকারবিরোধী মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেন। এর মধ্যে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়, শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, আমিরকবির বিশ্ববিদ্যালয় এবং শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য।
বিক্ষোভ চলাকালীন শিক্ষার্থী ও সরকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সরকার সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-সংযুক্ত আধাসামরিক বাসিজ সংগঠনের সদস্য বলে জানা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাইরে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ধাক্কাধাক্কির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পবিত্র শিয়া নগরী মাশহাদের ফেরদৌসি বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে নিরাপত্তা বাহিনী শিক্ষার্থীদের দিকে দৌড়াচ্ছে। এর আগেও জানুয়ারিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল, যা তখনও সাড়া ফেলেছিল।
এদিকে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ইরান সম্প্রতি তাদের ইউরেনিয়ামের মজুত কমাতে রাজি হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘গার্ডিয়ান’-এর বরাতে জানা গেছে, ইরান ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ২০ শতাংশ বা তার নিচে নামাতে সম্মত হয়েছে, তবে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ৩০০ কেজি ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে তারা এখনও অনড়। এই প্রস্তাব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করার পরও ইরান নতিস্বীকার করতে রাজি হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অনড় অবস্থার কারণ বুঝতে ‘কৌতূহলী’ হয়ে উঠেছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও হুমকির মুখেও স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রেখেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তির একটি খসড়া প্রস্তাব আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে। তবে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে চাপের মুখে তারা নতিস্বীকার করবে না। রোববার ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি নিশ্চিত করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরবর্তী দফার আলোচনা বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের মধ্যেই ইরান দেশের ভেতরে উত্তেজনা মোকাবেলা করছে। শিক্ষার্থীরা নতুন প্রজন্মের অংশ হিসেবে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বচ্ছতার দাবিতে সরব, যখন সরকারের পক্ষ থেকে আধাসামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থার মাধ্যমে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করছে, বিশেষ করে তখন যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে।
বিক্ষোভের ভিডিও ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি জানাতে চাইলেও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে হতাহতের ঘটনা ঘটার ঝুঁকি রয়েছে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, শহরের বিভিন্ন কেন্দ্রে নিরাপত্তা বাহিনী শিক্ষার্থীদের ওপর নজর রাখছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক আলোচনার সংমিশ্রণ দেশটিকে একটি জটিল অবস্থায় ফেলেছে। শিক্ষার্থীরা সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতার দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার আন্তর্জাতিক চাপ ও মধ্যপ্রাচ্যীয় উত্তেজনার মুখে তাদের অবস্থান শক্ত রাখছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইরানের ভেতরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে শিক্ষার্থীদের ভূমিকার ওপর কেন্দ্রিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুনরায় খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে যে তরুণ প্রজন্ম দেশের ভবিষ্যত নীতি-নির্ধারণে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে চাইছে।
ইরানজুড়ে এই বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন দেশটির নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক সমঝোতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে শান্তি বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।