প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জে এক যুবকের রহস্যজনক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে বাড়িতে ফেরার মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে পরিকল্পিতভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা এলাকার মাসদাইর মিস্ত্রিবাগে সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে। নিহত যুবকের নাম ইমন (৩৯)। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা ওমর খৈয়ামের ছেলে।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, দীর্ঘদিন কারাভোগের পর সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে জামিনে মুক্ত হয়ে বাড়িতে ফেরেন ইমন। পরিবারের সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণ পরই ফেরদৌস নামে এক পরিচিত যুবক তাকে ফোন করে বাইরে যেতে বলে। পরিবারের সন্দেহ, সেই ফোনকলই ছিল হত্যাকাণ্ডের ফাঁদ। ইমন বাইরে বের হয়ে মিস্ত্রিবাগ এলাকায় পৌঁছালে সেখানে আগে থেকেই ওঁত পেতে ছিল একদল দুর্বৃত্ত। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা সামনে পেয়েই ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে।
আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে ইমন দৌড়ে কাছাকাছি একটি বাড়িতে আশ্রয় নিতে যান। স্থানীয়রা জানান, তিনি সাদেক মিয়ার বাড়ির ভেতরে ঢুকে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু হামলাকারীরা সেখানে ঢুকেও তাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।
নিহতের বাবা ওমর খৈয়াম সাংবাদিকদের বলেন, “আমার ছেলে ভুল পথে জড়িয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সে বাড়ি ফিরে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চেয়েছিল। আমরা ভাবছিলাম সব ঝামেলা শেষ। কিন্তু কারাগার থেকে বের হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তাকে এভাবে মেরে ফেলবে— এটা কল্পনাও করিনি।” তার অভিযোগ, পূর্বশত্রুতা ও মাদক ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানান, ইমন এলাকায় একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিল। ওই গ্রুপের নেতৃত্বে থাকা জাহিদ ও তার সহযোগীদের সঙ্গে মাদক ব্যবসা ও টাকার ভাগাভাগি নিয়ে আগে থেকেই বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধই ধীরে ধীরে শত্রুতায় রূপ নেয়। স্থানীয়দের ধারণা, কারাগার থেকে বের হওয়ার খবর পাওয়ার পরই প্রতিপক্ষরা পরিকল্পনা করে তাকে হত্যা করে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের মধ্যে হৃদয় ওরফে চক্ষু হৃদয় এবং আরও কয়েকজনের নাম স্থানীয়ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ একই দিন বা এর কাছাকাছি সময়ে কারাগার থেকে জামিনে বের হয়েছে।
ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাতেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে। বিষয়টি নিশ্চিত করে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, হত্যাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে একাধিক টিম কাজ করছে। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং মাদক ব্যবসা–সংক্রান্ত বিরোধই মূল কারণ হতে পারে। তদন্তের স্বার্থে সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধ জগতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রায়ই সহিংস রূপ নেয় এবং অনেক সময় তা প্রকাশ্যে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়। বিশেষ করে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ হলে প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই ঘটনায়ও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে তাদের ধারণা। তবে তারা মনে করেন, প্রকৃত সত্য জানতে হলে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, একজন ব্যক্তি কারাগার থেকে বের হওয়ার পর এত দ্রুত কীভাবে হামলার শিকার হলো এবং তার গতিবিধি সম্পর্কে হামলাকারীরা এত নির্ভুল তথ্য পেল কীভাবে। কেউ কেউ মনে করছেন, তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। যদিও পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু জানায়নি।
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই কিছু চিহ্নিত গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। মাঝে মাঝে সংঘর্ষ ও মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। বাসিন্দারা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ড তাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তারা দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং একটি বড় সামাজিক সংকেতও বটে। অপরাধচক্র, মাদক ব্যবসা ও স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তার শিকার হয় মানুষ ও সমাজ। তাই শুধু হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; এর পেছনের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াও জরুরি।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের কল রেকর্ড, সাম্প্রতিক যোগাযোগ ও বিরোধের ইতিহাস খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তারা আশা করছেন, প্রযুক্তিগত তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে দ্রুতই হত্যার পরিকল্পনা ও জড়িতদের পরিচয় স্পষ্ট হবে। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।
ঘটনাটি আপাতত স্থানীয়দের কাছে একটি আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। জামিনে মুক্তির পর নতুন জীবন শুরু করার আগেই এমন মর্মান্তিক পরিণতি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার মানুষকে নাড়া দিয়েছে। এখন সবার চোখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে— তারা কত দ্রুত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পারে।