বিতর্ক পেরিয়ে শুরু অমর একুশে বইমেলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৯ বার
অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ আয়োজন

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির আবেগ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যপ্রেমের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ শুরু হলো অমর একুশে বইমেলা–২০২৬। নানা বিতর্ক, তারিখ পরিবর্তন, প্রকাশকদের দাবি এবং প্রশাসনিক জটিলতার পর অবশেষে বইপ্রেমীদের জন্য প্রস্তুত হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত এই সাংস্কৃতিক আয়োজন। আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, সব বাধা অতিক্রম করে মেলার সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে বর্ণিল প্রাঙ্গণ।

এবারের আয়োজন ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। বছরের শুরুতে সংসদ নির্বাচন ও পবিত্র রমজান মাসের সময়সূচি বিবেচনায় নিয়ে মেলার তারিখ একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়। প্রথমে ডিসেম্বর মাসে আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হলেও প্রকাশক ও সাহিত্যাঙ্গনের জোরালো আপত্তির মুখে সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয়। ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক সম্পর্ক অটুট রাখার দাবিতে লেখক, প্রকাশক ও পাঠকসমাজ একযোগে সোচ্চার হলে শেষ পর্যন্ত ফেব্রুয়ারিতেই মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। পরে প্রশাসনিক সমন্বয়, রাজনৈতিক সময়সূচি এবং বিভিন্ন পক্ষের মতামত বিবেচনা করে ২৬ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

আয়োজক কমিটির আহ্বায়করা জানান, নতুন সময়সূচি নির্ধারণের আগে লেখক, প্রকাশক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে মেলা আয়োজনের দিন ঠিক করা হয়, যাতে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে বইমেলা শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক।

রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণজুড়ে ইতোমধ্যে সাজসাজ রব। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দর্শনার্থীদের চলাচলের সুবিধার্থে ইট বসানো পথ তৈরি করা হয়েছে এবং স্টল নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ। অনেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্টল নান্দনিকভাবে সাজিয়েছে। কোথাও বইয়ের প্রচ্ছদনির্ভর থিম, কোথাও লেখককেন্দ্রিক নকশা, আবার কোথাও আধুনিক আলোকসজ্জা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই সাজসজ্জা শুধু বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার অংশ নয়, বরং বইকে কেন্দ্র করে এক ধরনের শিল্পিত পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়াস।

এ বছর সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে, যা সংখ্যার দিক থেকে উল্লেখযোগ্য। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠান স্টল নিয়েছে। মোট ইউনিট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজারেরও বেশি। পাশাপাশি ৮৭টি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য আলাদা স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য বিশেষ চত্বরও রাখা হয়েছে। আয়োজকদের মতে, এই অংশগ্রহণের ব্যাপকতা প্রমাণ করে যে বইয়ের প্রতি আগ্রহ এখনো অটুট রয়েছে।

রমজান মাসে মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। আয়োজকরা জানিয়েছেন, দর্শনার্থীদের জন্য ন্যায্যমূল্যে ইফতারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, নামাজের জন্য অস্থায়ী মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে এবং অজু ও শৌচাগারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিদিন বেলা দুইটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে, আর ছুটির দিনে সকাল এগারোটা থেকেই প্রবেশ করা যাবে। তবে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার স্বার্থে রাত সাড়ে আটটার পর নতুন দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হবে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেলা ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টা নজরদারি থাকবে। মেলা প্রাঙ্গণে স্থাপিত নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের বিশেষ টিম, গোয়েন্দা ইউনিট, বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল এবং বিশেষায়িত বাহিনী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা হুমকির তথ্য না থাকলেও সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। বইমেলা চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল সীমিত থাকবে এবং দর্শনার্থীর চাপ অনুযায়ী কিছু সড়ক সময়ভিত্তিক খোলা বা বন্ধ রাখা হবে। নির্দিষ্ট স্থানে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং অননুমোদিত স্থানে গাড়ি রাখলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ। আয়োজকদের মতে, এসব ব্যবস্থা দর্শনার্থীদের যাতায়াত সহজ ও নিরাপদ করতে সহায়ক হবে।

মেলা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, আলোচনা ও বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা হবে এবারের আয়োজনের। আয়োজকদের প্রত্যাশা, উদ্বোধনী দিন থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়বে এবং ধীরে ধীরে মেলা প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

তবে আয়োজন ঘিরে মতভেদও রয়েছে। কিছু প্রকাশক মনে করছেন, রমজান মাসে মেলা হওয়ায় বিক্রির পরিমাণ কমতে পারে এবং ব্যবসায়িক দিক থেকে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। অন্যদিকে অনেক প্রকাশক ও লেখক বলছেন, রমজান আত্মশুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার মাস হওয়ায় এই সময় বইমেলা আয়োজনের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। তাদের মতে, পাঠ ও চিন্তার সঙ্গে রমজানের আধ্যাত্মিক পরিবেশ মিলিত হলে সাংস্কৃতিক আবহ আরও গভীর হয়।

সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মতে, অমর একুশে বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি বাঙালির ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা এবং জাতির সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক। প্রতি বছর এই আয়োজন নতুন লেখককে পরিচিত করে, পাঠকের সামনে তুলে ধরে নতুন বই এবং সাহিত্যাঙ্গনে তৈরি করে নতুন আলোচনা। তাই নানা জটিলতা সত্ত্বেও মেলার আয়োজন সফল হওয়া সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এই আয়োজনের পেছনে প্রশাসনিক সমন্বয়ও ছিল উল্লেখযোগ্য। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পরিকল্পনা প্রণয়ন পর্যায়ে আগের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল, যখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। পরে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রস্তুতিকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। এতে বোঝা যায়, বইমেলার মতো জাতীয় সাংস্কৃতিক আয়োজন দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে নানা বিতর্ক, মতভেদ ও সময়সূচির জটিলতা পেরিয়ে শুরু হওয়া এবারের বইমেলা ঘিরে এখন প্রত্যাশা একটাই—পাঠক, লেখক ও প্রকাশকের মিলনমেলায় মুখর হোক প্রাঙ্গণ। বইয়ের পাতায় নতুন চিন্তা, নতুন গল্প আর নতুন স্বপ্নের আলো ছড়িয়ে পড়ুক পাঠকের মনে। ভাষার মাসে বইয়ের এই উৎসব আবারও প্রমাণ করুক, বই এখনো মানুষের জ্ঞান, কল্পনা ও সংস্কৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী সেতুবন্ধন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত